শত্রু মিত্র জেনেই এগোতে হয়, বাংলায় কে শত্রু?

আমাদের রাজ্যে গত ছ’বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস দলের সরকার চলছে। সম্প্রতি রাজ্যে এবং কেন্দ্রে পর পর কয়েকটি ঘটনায় এই রাজ্যে কে কার শত্রু কে কার মিত্র সেটা বুঝতে সাধারণ মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত মানুষই ঠিকমত ঠাউর করে উঠতে পারছে না। প্রশ্ন উঠছে বাংলায় কে শত্রু কে মিত্র? বলবে কে? কোন দলের কোন নেতা মানুষকে বলার, বোঝানোর দায়িত্ব নেবে? সব কিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে না?

এই প্রশ্ন রেখেই লেখাটি শুরু করা যাক। সালটা ছিল ১৯৯৭। ব্যগতিগতভাবে আমি এক যুগ আগেই সরাসরি ময়দানের রাজনীতি থেকে তখন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। কিন্তু সে বছর পুরনো এক দাদা তথা জেল খাটা এক বামপন্থী নেতার কথায় তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম। নতুন রাজনীতির ছবি বুঝে নিতে। ভদ্রলোক তখনও মূল ধারার বামপন্থীদের সঙ্গে ভিড়তে পারছেন না। কারণ প্রমোদ দাসগুপ্ত এবং পরে অনিল বিশ্বাস। প্রমোদবাবু আমার পরিচিত সেই নেতাকে বলেছিলেন, ‘আপনি অনেক বড় নেতা। অবশ্যই তাত্বিক নেতা এবং দক্ষ সংগঠক। সেটা মানতে অসুবিধা নেই। কিন্তু সিপিএমে সরাসরি কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনও দলের বা গোষ্ঠীর নেতাকে নেওয়া হয় না। আপনাকে আমাদের দলে আসতে হলে নীচের তলার কমিটির সদস্য হয়ে আসতে হবে।‘’ প্রমোদবাবু এই কথা সেই ভদ্রলোককে জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরে ১৯৭৮-১৯৮০ সালের মধ্যে কোনও একসময় বলেছিলেন।

খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই ভদ্রলক ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বামপন্থীদের মূলস্রোতের সঙ্গে নিজের গোষ্ঠীকে জুড়ে ফেলতে সচেষ্ট ছিলেন। যদিও সেটা আজও সম্ভব হয়নি। সিপিএম এমনই একটা দল। ১৯৯৬ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অনেকটাই জটিল। যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে সিপিএম দলের প্রবীণ নেতা জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন না। এই বিতর্কে দল আড়াআড়ি দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। নতুন দল গড়ে উঠবে তার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালে আমি সেই জেলখাটা দাদার সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগণা জেলার একটি গঞ্জ শহরে গিয়েছিলাম। নতুন দল গড়ে ওঠার একটি প্রস্তুতি বৈঠক সরেজমিনে পরখ করতে। দলটি যদিও পরে বাস্তবে রূপ পায়। অত্যন্ত সংবেদনশীল বামপন্থী ছাত্রযুব নেতা এবং তাত্বিক নেতা সৈফুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে সেই দল গড়ে উঠেছিল। বামপন্থীদের মধ্যে গুঞ্জন ছিল সেই দলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন কমরেড সুভাষ চক্রবর্তী। সেই মোতাবেক একটি নতুন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ হয়। ১৯৯৯ সালে বাজারে আরও গুঞ্জন ছিল ২০০১ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে সুভাষ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করে রাজ্যে ভোটে লড়াই করবে। এবং এই জোট জিতলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হবেন। কমরেড সুভাষ চক্রবর্তী উপ মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এবং অন্যন্যরা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাবেন। শেষ পর্যন্ত সব উদ্যোগ ভেস্তে যায় কমরেড অনিল বিশ্বাসেরমতো দক্ষ সংগঠকের কুশলী চালে।

২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ডঃ মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকারের আমলে এই রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের কাহিনী আমরা প্রায় সবাই জানি। অতীত টেনে আনার কারণ রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশ হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস দল ভেঙ্গে নতুন দল হতে পারে। ১০ জন সাংসদ এবং ৬০ জন বিধায়ক এই নতুন দলে যোগদান করবেন। এইরকম একই গল্পকথা আমরা রাজ্যে ২০১৩ সালেও শুনেছিলাম। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক প্রস্তুতির সময়। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙ্গে পৃথক একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত গোষ্ঠীটি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়ে খুব সম্প্রতি আরও একটি খবর সংবাদ মাধ্যম আমাদের সামনে প্রকাশ করেছে। খবরটি হল দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাদের অনুগামীদের নিয়ে বিজেপিতে যোগদান করতে পারেন। রাজ্য বিজেপি দলের সভাপতি দিলীপ ঘোষের কথাতেও সেই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

রাজ্য সিপিএমের একটি বড় গোষ্ঠীর কয়েকজন শীর্ষনেতা নব্বইয়ের দশক থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ ম্যনেজারদের সঙ্গে মতাদর্শগত লড়াই চালিয়ে আসছেন। তাদেরই কয়েকজন প্রতি তিনবছরের ব্যবধানে ১৯৬৪ এবং ১৯৬৭ সালের মতো আবার একটা নতুন মঞ্চের কথা ভাবেন। কয়েক বছর আগের টাটকা স্মৃতি অনেকের আছে এমনটা আশা করা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, টিভি সঞ্চালক, সাংবাদিক, নিবন্ধ লেখক মায় বিরোধী বুর্জোয়া দলের নেতারাও মনে করতে পারবেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সিপিএম নামক দলটির তিন তিনটে পার্টী কংগ্রেস হয়ে গেছে। এবং কলকাতায় একটি সাংগঠনিক প্লেনাম। উল্লেখিত তিনটে পার্টি কংগ্রেসের আগে আমরা শুনেছি বঙ্গ সিপিএম আলাদা দল করবে। এই আলোচনা দলের অভ্যন্তরে যেমন হয়। ‘রেজিমেন্টেড’ দলের অভ্যন্তরীন কলহের খবর গত এক দশক হাটে বাজারে কান পাতলেও শোনা যায়। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেও এতটা খোলামেলা বামপন্থী দল সিপিএম ছিলো না। ২০১৮ সালে প্রস্তাবিত হারদারাবাদ পার্টী কংগ্রেসেও সিপিএম দলের ‘বাংলা বাঁচাও’ গোষ্ঠী নতুন করে সংগঠিত হতে চাইছে। আবার একটা নতুন বামপন্থী দল?

দেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, লোকাচার, ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতপাতের সমস্যা, ইত্যাদি বিষয়ে সিপিএম নামক দলটি কমরেড সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বে ভারতীয় ঘরানায় নিজেদের হাজির করতে চাইছে। যদিও বর্তমান ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বামপন্থীদের কাছে অত্যন্ত জটিল। আর তাই হয়ত বামপন্থীদের সামনে সঠিক দিশা কোনটা সেটা তারাও ভারতীয় নাগরিদের বোঝাতে পারছেন না। সারা দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এই রাজ্যের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। কারণ সিপিএম নামক বামপন্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বাংলায় কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করা যাবে না। রাজ্যের সংগঠনে গুরুত্ব দিতে হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, কমরেড হান্নান মোল্লার নেতৃত্বে দেশের কয়েকটি রাজ্যে কৃষক আন্দোলন দলকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছে। কমরেড প্রকাশ কারাতের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা একই কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন বাংলায় সংগঠনে নজর দিতে। কংগ্রেসের সমর্থনে এবছর রাজ্যসভায় সীতারাম ইয়েচুরির যাওয়াটাও আটকে দিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দলীয় সূত্র এবং সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া খবর এই সারসত্য আমাদের সামনে এনে ফেলেছে। সম্প্রতি খবরে প্রকাশ রাজ্য সিপিএম নেতৃত্ব ২০১৮ সালের পার্টী কংগ্রেসের আগে আবার প্রস্তুত হচ্ছে। বাংলার বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নতুন একটি দলের খাতা খোলার। আগামীতে সেই পরিকল্পনা কতটা সম্ভব সেটা ভবিষ্যৎ বলতে পারবে। হুতোম আমাক বলেছে, ‘বঙ্গ সিপিএম দলে মানবিকতা আছে এমন নেতাদের বড় বেশি প্রয়োজন। ব্যক্তি কেন্দ্রীক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষের সঙ্গে প্রতিহিংসা নয়। পরশ্রীকাতরতা নয়। সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক নেতারাই পারেন দলের গোষ্ঠী কোন্দল সামাল দিতে।’

কিছুদিন আগে রাজ্যে ছ’টি রাজ্যসভার আসনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বামপন্থীদের মধ্যে প্রকাশ্যে মতভেদ লক্ষ্য করা গেছে। এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যপাধ্যায়। সিপিএমের সমালোচনায় সরব হন মমতা। তিনি বলেন, ‘’রাজ্যসভার এই পদে সৌজন্যের নিরিখে সিপিএমের সমর্থন করা উচিত ছিল কংগ্রেস প্রার্থী প্রদীপ ভট্টাচার্যকেই। কিন্তু তাঁরা চূড়ান্ত অসৌজন্যের রাজনীতি করেছেন। এতদিন কংগ্রেস রাজ্যসভার সাংসদ পদপ্রাথী হিসেবে দিল্লীর সিপিএমের নেতার নাম প্রস্তাব করে অপেক্ষা করেছিল। তাঁর নাম বাতিল করেছে সিপিএমই। তারপরই কংগ্রেস নিজেদের প্রাথী দিয়েছে। তাই সিপিএম তাঁকে সমর্থন না করে ঠিক কাজ করেনি।‘’

বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু মমতার এই বক্তব্যের পরে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন। রাজ্য কংগ্রেসের সমালোচনা করেন, প্রাথী প্রদীপ ভট্টাচার্যের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। কংগ্রেসকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘’কংগ্রেস কখনও যৌথ প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবেইনি। সবসময় নিজেদের ইচ্ছাই চাপিয়ে দিতে চেয়েছে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের উপর। বামফ্রন্ট সব সময় যৌথপ্রার্থী দেওয়ার পক্ষেই ছিল।‘’

বিমানবাবু আরও বলেন, ‘’কংগ্রেস সীতারাম ইয়েচুরির নাম প্রস্তাব করে নিজেদের অবস্থান থেকে। তারপর প্রদীপ ভট্টাচার্যের নাম চূড়ান্ত করার আগে কোনওরকম আলোচনা করা হয়নি আমাদের সঙ্গে। আমরা অরাজনৈতিক প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলাম। কিন্তু কগ্রেস দলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রার্থী করে প্রদীপ ভট্টাচার্যকে। তারপরেই রাজ্য সভার আসনে পালটা লড়াইয়ের সিদ্ধাত নেওয়া হয় বামফ্রন্টের তরফে। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করা হয়।‘’

রাজ্যসভার আসনে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা তথা প্রাক্তণ রাজ্য সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্যকে সমর্থন করে তৃণমূল নেত্রী ভুলে থাকা ‘আঁতুড় ঘর’-এ কি ফিরতে চলেছেন? ‘আঁতুড় ঘর’ কথাটি আজ ‘মিথ’ হয়ে গেছে বলা যায়। কথাটি আলোচ্য প্রতিবেদকের নয়। কংগ্রেস নেতা, প্রাক্তণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে মহাকরণে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আঁতুড় ঘরকে ভুলে যেতে নেই।’ তৃণমূল কংগ্রেসের এই আঁতুড়ঘরে ফেরা শুরু হয়েছিল এবছরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ১৭ দলের জোট রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী প্রার্থী হিসবে মীরা কুমারকে সমর্থন করে। ওই একই জোট উপ রাষ্ট্রপতি পদে গোপালকৃষ্ণ গান্ধিকে সমর্থন জানায়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তৃণমূল নেত্রী সামনে থেকে কংগ্রেসের সভানেত্রী সনিয়া গাঁধি এবং সহ সভাপতি রাহুল গাঁধির সঙ্গে যৌথভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অভিঞ্জ রাজনীতিক হিসাবে তৃণমূলনেত্রী যেভাবে রাষ্ট্রপতি এবং উপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ইস্যু করে নিজের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আড়াল করতে চেয়েছিলেন সেটা সম্ভবত আর সম্ভব হয়নি। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্রস ভোটিং এই রাজ্য থেকেও হয়েছে। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের বিধায়ক-সাংসদদেরও সন্দেহের তালিকায় নাম রয়েছে। উপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই রাজ্যের কয়েকজন তৃণমূল সাংসদ ভোট দিতেই গেলেন না।

গণতান্ত্রিক দেশে সব দলেই আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা কলহ থেকেই থাকে। সেক্ষেত্রে তৃণমূল নামক একটি দলে ব্যক্তিস্বার্থ এবং গোষ্ঠীস্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেবে এমন অনুমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেক আগেই করে রেখেছিল। দলটি যেহেতু ‘দিদি’ তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রিক। তাই তাঁর ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করছে দলটির আগামী কর্মসূচি। এবছরের ২১ জুলাইয়ের সভা থেকে নতুন পোশাকে একদল নতুন যুব নেতৃত্বকে আমাদের সামনে হাজির করানো হয়েছে। তৃণমূল দলটির এখনও একছত্র নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে মিথ হয়ে যাওয়া ‘দিদি’র জনপ্রিয়তা দু’এক বছরে শেষ হয়ে যাবে না। আগামী ১১ অগষ্ট রাজ্যের সাতটা পুরসভার নির্বাচন আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা কতটা অটুট? সূত্রের খবর নলহাটি পুরসভা নির্বাচনের আগে ২০০ কংগ্রেস সমর্থক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছে। এই জনপ্রিয়তা কতদিন থাকবে? নতুন আর্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে?

বাস্তব মুদ্রার অন্যপীঠে আছে, সম্প্রতি আকস্মিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। শান্ত পাহাড় আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। উত্তর ২৪ পরগণা জেলাকে কেন্দ্র করে রাজ্য অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল। রাজ্য প্রশাসন শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ একথা বলতেই হবে। শান্ত রাজ্যের কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন কিছু কিছু আইন শৃঙ্খলার সমস্যা হলেও পাহার এবং উত্তর ২৪ পরগণা মুখ্যমন্ত্রীর কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। তৃণমূল নেত্রী তাঁর সফল যাত্রা শুরু করেছিলেন ৩৪ বছরের সিপিএম তথা বামফ্রন্টকে একমাত্র এবং প্রধাণ শত্রু ভেবে। এবং এই রাজ্যে সিপিএমের ‘বি টিম’ কংগ্রেসকে ছোট শত্রু করেই তিনি ভেবেছেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পর বিজেপি নামক দলটি কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এককভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের সরকার গড়ার পর অপ্রতিহত গতিতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও। অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথা। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘’২০১৭ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত দেশের শীর্ষ পদে বিজেপির প্রতিনিধি থাকবেন।‘’

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই কথায় যে বার্তাই থাকুক একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশের সব শ্রেণির মানুষ সম্পর্কে আরও যত্নশীল হবেন এমনটা আশা করা আমদের কি বাতুলতা হবে?

বিজেপি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দলের সর্বভারতীয় প্রসার কর্মসূচী অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গেও তাদের নির্দিষ্ট কর্মসূচী নিয়ে এগতে চাইছেন। পেল্লাই বড় এক হাঁ করে দলটি এই রাজ্যে ছুটে আসছে। যাকে অনেকে ‘হাঙর’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে কংগ্রেস, সিপিএম সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দল যেমন আছে বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করছে তাঁরা থাকলে আপত্তি কিসের? উন্নয়নের শ্লোগান আর সংস্কারের শপথ নিয়ে দলটি এগতে চাইলেও প্রগতিশীল ভারত তথা অবশ্যই এই প্রগতি ধারার ঐতিহ্য বয়ে চলা সহিষ্ণু এই বাংলা বিজেপি দলের সব করমসূচী মেনে নিতে চাইছে না। দলটির দাবি অনুযায়ী ভারতের সব রাজ্যে তাদের সংগঠন করার অধিকার আছে। কিন্তু বেকার সমস্যা, কৃষি সমস্যা, দলিত নিগ্রহ সহ একাধিক সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সহ একাধিক বিরোধী দল। ৬ জুন, ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধি বলেন, ‘’মানুষ কী ভাবে জীবন যাপন করবেন, তা-ও আজকাল চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভাজনকারী বিষয়গুলিকে সামনে তুলে আনা হচ্ছে।‘’

রাজ্যের এই হ জ ব র ল অবস্থা এর আগে কি হয়েছিল? আমরা পারিবারিক শিক্ষা বা সামাজিক শিক্ষা থেকে জানি শত্রু মিত্র চিনেই সামনে এগতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজ্যের যা অবস্থা কে কার শত্রু? চিনব কি করে? চেনাবেই বা কে? কারণ প্রদেশ কংগ্রেস যে দায়িত্ব নেবে শোনা যাচ্ছে সেই প্রদেশ কংগ্রেস দলেও আবার একটা ভাঙন হতে পারে। রাজ্যের মানুষ কতগুলি ভাঙন দেখবে বলুন দেখি? আপনারা হয়ত বিশ্বাস করবেন না। শ্রদ্ধেয় সুশীল পাঠকমণ্ডলী কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে আমার একমাত্র অভিভাবক হতোমের দেখা হয়েছিল। সময়-অসময়ের বর্ষার জলে চুবুর ভিজা হয়ে সেদিন একটা গাছে বসে ডানা ঝাপ্টাচ্ছিল। হুতোমের ডানার জল আমার গায়ে পড়তেই আমি বুঝলাম হুতোম কোথাও একটা আছে। হুতোমের ডানার জলে একটা পবিত্র গন্ধ আছে। সততার গন্ধ আছে। এদিক ওদিকে তাকাচ্ছি। মুটে মুনিষদের মত। হুতোম বলল, নীচের দিকে দেখছিস কেন? উপরের দিকে তাকা। উপরের দিকে চাইতে শিখেছিলাম চার্লি চ্যাপলিনের কথা থেকে। চ্যাপলিন বলেছেন, ‘’নীচের দিকে দেখতে নেই। সব সময় উপরের দিকে দেখতে হয়। তবেই সাত রঙের আকাশ (রেনবো) দেখা যায়।‘’ আজ আবার হুতোম মনে করিয়ে দিল। অপরাধীরমতো করে বললাম, ‘বেশ বেশ ভুল হয়ে গেছে।’

হতোম খিল খিল করে হেসে বলল, ‘’খুব রাজনীতি কপচালি যে বড়? দ্যাখ কোন দাদা তোর ছাল তুলতে না আসে। নুন লঙ্কা লেবু এর আগে কতদিন কতবার ছাল তুলে তোর গায়ে মাখিয়েছে। তাও তুই ‘আগডুম- বাগডুম’ লিখছিস?  একাল-সে-কাল কত কালের কথা লিখলি। আম গেল জাম গেল কাঁঠাল গেল। এখন হিলসা এল যে। ওই কথাটাও লেখ এবার। এখন সময় হয়েছে। কূলে নৌকা ভেড়া।‘’

‘কোন কথাটা বলছ?’ জানতে চাইলাম।

‘ইতিহাস কপচাচ্ছিস যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন যে কথাটা তোদের দিদিকে বলেছিলেন। মনে আছে? বাংলার এক ব্রাহ্মণ কংগ্রেস নেতা সম্পর্কে কি বলেছিলেন তিনি তৎকালীন যুব কংগ্রেসের নেত্রি মমতাকে? বর্তমান প্রেক্ষাপটে তৃণমূল নেত্রী কি বলবেন?’’

হুতোমের সাহায্য ছাড়া একথা কি মনে করতে পারতাম? আজ মনে পড়ল। গত কয়েক বছর আগে রাজ্যের সংখ্যালঘু কমিশনের এক চেয়ারম্যান আমাকে বলেছিলেন, ‘’প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘আমি মস্ত বড় একটা ভুল করেছি। এমন দু’জনকে কংগ্রেসে আনলাম তাঁরা কংগ্রেস দলটা তুলে দেবে! মাননীয় তৃণমূল নেত্রী আপনার কাছে হুতোম জানতে চাইছে আপনি সেই নাম দু’টো সময় সুযোগমতো বলবেন আশা করি।

বর্তমান ভারতে রাজনৈতিক শুন্যতার সুযোগে বিজেপি অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে আসছে ঠিকই। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করছে সর্বদলীয় গণতন্ত্রে কংগ্রেস ১৩০ বছরের দল। ৬০ বছর দেশের সরকার পরিচালনায় সাফল্য এবং ব্যর্থতার সঙ্গে কংগ্রেস ছিল। সেই দলের সহ সভাপতি রাহুল গাঁধির নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ নেতা এগিয়ে এসছেন। কংগ্রেস দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে আম মানুষের দাবি নিয়ে সংসদে আরও সোচ্চার হোক। কংগ্রেসের এই মিছিলে আমরা অত্যন্ত সংবেদনশীল মুখ, গুণি একজন মানুষ গোপালকৃষ্ণ গাঁধিকে দেখতে চাইছি। ভারতীয় গণতন্ত্রের বিকাশের প্রয়োজনে, সহিষ্ণু ভারতের বার্তা, দলিত রাষ্ট্রপতির দেশের কথা সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গোপালকৃষ্ণ গাঁধির মতো ব্যক্তিত্বকে আজ দেশের মানুষের খুব প্রয়োজন। আগামী ১৫ অগষ্ট দেশ গণতন্ত্রের ৭০ বছরের সাফল্য উদযাপন করবে। এশিয়া মহাদেশ তথা ভারতীয় উপ মহাদেশে বহু দলীয় গণতন্ত্রের অন্যতম ব্যতিক্রমী দেশ ভারত। সেই দেশের নাগরিক হিসাবে আমরাও গর্বিত।

 

 

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s