পঞ্চজনের ঢুলি আহা বেশ বেশ বেশ

পথিক পথ হারায় নায়। এই সময়কালের প্রেক্ষিতে বিচার করিলে আমাদিগের পথিক কে ত্রয়োদশ বঙ্গাব্দের শেষ দশকে অন্য পথের কথা বলা হইয়াছিল। পথিক আপন পরিবার এবং আরও কিছু ভাবিয়া আপনার পার্থিব সুখ পরিহার করিবার মনস্থ করে। তৎকালে ভরতরাজের সাম্রাজ্যে নতুন শাসক তার সুচতুর বুদ্ধিবলে নিজস্ব বলয় করিয়া লইয়াছেন। সেই নব্য সম্রাট নিদান দিয়াছিলেন তোমাদিগের এই পথিক তার পাখিকে সঙ্গে লইয়া লাক্ষাদ্বীপ চলিয়া যাক। আমার পারিষদগণ তোমাদিগের পথিককে লাক্ষাদ্বীপের বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকুরি করিয়া দিবে। আমি ভরতরাজের পুরা শাসন লইবার আগে ওই পথিককে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় কয়েক বছরের জন্য সভ্য করিয়া লইব। সে আমার বলয়ে থাকিবে। পঞ্চজনের কাজ করিবে তবে ঢুলি হইয়া নহে। রাজবাদক হিসাবে। আমি যাহা যাহা কহিব আমার ঘনিষ্ঠ চাটুকারের ন্যায় তাহাকে বলিতে হইবে ‘আহা বেশ বেশ বেশ’। কোনও প্রশ্ন তুলিতে পারিবে না। প্রশ্ন তুলিবার অবকাশও দেওয়া হইবে না। যখন যাহা বলিবার হইবে রাজবাদকের ন্যায় শিখিতে হইবে। বাক্যে সংযম আনিতে হইবে।

সম্রাট যে সময়ের কথা বলিতেছেন তৎকালে ‘হীরক রাজা’ সংবিধান চিনাইয়াছিলেন। তাই সম্রাট মনে করিয়া দিয়াছিলেন যে তিনি হীরক রাজা নহেন। তিনি কোনওরূপ যন্তর মন্তরে কাহাকেও প্রবেশ করান নায়। ভবিষ্যতে করাইবেন এমন পরিকল্পনা তাহার ছিল না। ময়ূরপঙ্খী রথে চড়িয়া তিনি বিভিন মহাদেশের সাগরের ঢেউ গুনিয়া পাহাড় উচ্চতার সভ্যতা অবলোকন করিয়াছেন। এবং সেই সভ্যতার ব্যাকারণ আপনার গুণে মুখস্ত করিয়াছেন। প্রয়োগ বিদ্যা তিনি শিখিয়া লইয়াছেন। ভরতরাজার ধ্রুপদী সংস্কৃতির সঙ্গে সাগর পাড়ের অচেনা সভ্যতার ব্যকারণ মিলাইয়া একপ্রকার সিরাপ তৈরি করিয়া লইয়াছিলেন। এই সিরাপ তাহার বলয়ের নতুন পুরনো সভাসদদিগকে নিয়মিতভাবে কয়েক দাগ করিয়া খাইতে হয়। তাহার ন্যায় ন্যায়রত্ন এই যুগে বিরল।

সম্রাটের কথা আমাদিগের পথিক শুনেনায়। তার পাখিকে তাহার কাছ হইতে কূটবুদ্ধি প্রয়োগ করিয়া অন্যত্র স্থানান্তরে ব্যবস্থা করিয়া দেওয়া হয়। উন্মুক্ত পাখিকে আবার শৃঙ্খলিত করা হয়। ব্রাহ্মণ সম্রাটের নীরব মন্ত্রণায়। খাঁচার পাখিকে বনে যাইতে দিতে চাহেন নায় তিনি। পথিকের সঙ্গে থাকিতে দিতে চাহেন নায় তিনি এবং তার আত্মীয়স্বজনগণ। পথিকের কাছ হইতে শুধু তাহার পাখিকে ছিনিয়া লওয়া হয় নায়। পথিকের কাছ হইতে তাহার ঢোলক, খঞ্জনী, চোখে কাজল লাগাইবার কাজললতা, কালো কাজল, কাজল কাঠি সব কিছুদিনের জন্য ছিনিয়া লওয়া হইয়াছিল। লাক্ষাদ্বীপ না পাঠাইতে পারিলেও পথিকের নতুন ঠিকানায় তাহার পারিষদরা গোপনে প্রবেশ করিয়া সব লন্ডভন্ড করিয়া দিয়া যায়। গৃহহীন পথিকের ইহাতে কি আর আসে যায়? পঞ্চভূতে একদিন বিলীন হইতেই হইবে। পঞ্চজনের ঢুলির ইহাতে কি আর আসে যায়? পঞ্চরসের আসর হইতে ‘ছেলে ছোকড়া’-এর দল কখন চুপিসারে আসিয়া ঢোলক দিয়া গেছে। কবিগানের কবিয়াল কাজল পেন্সিল দিয়া গেছে। বিদ্রুপ হজম করিবার মন্ত্র বলিয়া দিয়াছিল তাঁরা।

কাজল কালো মেঘে যেমন করিয়া বৃষ্টি আপন মহিমায় বিচরণ করে তাহার ভাষা শিখাইয়া দিয়াছে উহারা। তৃষ্ণার্ত পৃথ্বী অবসন্ন গোধূলী বেলার বৃষ্টিধারায় ভিজিয়া ভিজিয়া সাত রঙের সাত ভাষা বলে। এই ভাষা পথিক শিখিয়া লইয়াছে। রাজার নয়, সম্রাটের নয়, পর্তুগীজের নয়, ইংরেজ বণিকের নয়, পঞ্চজনের ঢুলি হইতে কহিয়াছিল উহারা। ছোট অলিতে গলিতে গান গাইবে কেউ কেউ। ছেঁড়া জামা পড়া মানুষের, উদুম গায়ের মানুষের, ল্যাজ ঝোলা কুকুর ল্যাজ নামিয়ে পাশে পাশে থাকবে। পথিককে বলিতে হইবে ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক………।’

সম্রাট কেন এরুপ করিয়াছিলেন। তাহার উত্তর লিখিবার সময় আজও আসেনায়। পথিককে নিঃস্ব করিয়া দিতে পারিয়াছেন! পথিকের আবার নিঃসঙ্গতা! পথের ঝড়া পাতাও পথিককে দেখিলে শুখা খটখটে রাস্তায় একটু একটু করিয়া পথ করিয়া দেয়। মর্মরিত হয় আগামীর বার্তা বাহক হয়ে। তখন আকাশে আমরা দেখিতে পাই বাঁকা চাঁদ হাসিতেছে। পূবের আকাশে ভোরের গর্বিত আলোর অহংকারে। পথিক পথ হারাইবে কেন? পথিক আলোক হারাইবে কেন? গহন গভীর অন্ধকারে সবুজ মাখা জোনাক সন্ধ্যায়, জোনাক রাতে একা চলিবার অবসরে পথিক কাজল পেন্সিল হাতে হাটিতে জানে। নিঃসঙ্গ, নিস্তরঙ্গ আকাশ বলিয়া কিছু হয় ইহা ‘ঝুমুর গানের’ সর্দার কোনও দিন বলে নায়। দুপুড়ের ঘুঘু কোনও দিন তার রোমান্টিক ‘ঘুঘঘু কই……’ ডাকে বলে নায়। ল্যাজ তুলে কাঠ বিড়ালি যখন পেয়ারা খায় তখন তার আশপাশে রৌদ্রস্নাত সোনালী বিকেল। পিউ কাঁহা ডেকে চলে। ঝিঝি পোকা জীবনান্দ থেকে উঠে আসে গ্রাম্য ঢুলির ঢোলকের ছন্দে। পঞ্চজনের ঢুলি হয়ে গান গেয়ে যায়। চেনা অচেনা পথিক।

পথিক পথ হারায় নায়। প্রলোভন ভুলিয়া আপনভোলা মনে পঞ্চজনের ঢুলি বাজাইতেছে। ফেনিল ঢেউ তাহার সামনে আছড়াইয়া পড়িলেও সম্রাটের চাটুকারের সহিত ‘আহা বেশ বেশ বেশ’ কহিবার জন্য কোনরূপ অনুভূতি অনুভব করেনায়। সুগন্ধি মাখা স্বর্গের নটী আসিয়াছে। নানা রূপ লইয়া। উহারা হয় আসিয়াছে অথবা সম্রাট নেপথ্যে হুকুম দিয়াছেন। উহাদিগের যাইবার জন্য। ছয় ঘোরার রথে চরিয়া তাহারা আসিয়া থাকে। রোপ্যখচিত ফিটন চড়িয়া তাহার আসিয়া থাকেন। রূপ, সাজসজ্জা, সুললিত কণ্ঠস্বর, সুগন্ধি ছাপানো বস্ত্রে স্বর্গের উর্বশী প্রমাণ করিতে চাহিবার উদগ্র বাসনা ছিল তাহাদের। যে খেলা তাহারা খেলিতে আসিয়াছিল তাহাতে ব্যর্থ হইয়া তাহার ফিরিয়া যায়। মর্তের নতুন দল আসে আরও উচ্চকিত ভাষায়। খাজাঞ্চি খুলিয়া বসিয়া খাকেন খাজাঞ্চিবাবু। ভান্ড উপুড় করিয়া স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা লইয়া আসে সম্রাটের খাসমন্ত্রী। সভা পারিষদ। রাজন্যবর্গ।  তবুও পথিক আজও পথ হারায় নায়। খট খটে প্রখর উত্তাপ তাহার কাছে বিদ্রুপের ন্যায় আসিতেছে গত চার দশক ধরিয়া। তবুও সে সম্রাটের কথা শোনে নায়। সম্রাট আবারও সুযোগ পাইলেই পথিককে ‘আহা বেশ বেশ’ বলিবার জন্য নানান ছলে বলে কৌশলে আপনার বলয়ে আনিতে সচেষ্ট থাকিয়াছেন। রাজসভার পারিষদ করিতে চাহিয়াছেন।

পঞ্চজনে কহিতেছে আগামী কয়েক প্রহরে সেই সম্রাটের সময়কালের অবসান হইবে। ভরত রাজের রাজ্যে ৭০ বৎসর হইল নতুন নিয়ম চলিতেছে। এই ৭০ বৎসর কালের মধ্যে আলোচ্য সম্রাট তার প্রত্যুৎপন্ন মেধা, ঞ্জান, তীক্ষ্ণ এবং ক্ষুরধার বুদ্ধি সহয়তায় আপন গরিমা বাড়াইয়া লইয়াছিলেন। জগৎ সভায় সব সম্রাটের ন্যায় নিজ আসন পাকা করিয়াছিলেন। একে একে মিনার খুলিয়া পড়িয়াছে। ঝাড় বাতির উজ্জ্বলতা কমিয়াছে। ‘জলসাঘর’ আর পারিষদ পাইতেছে না। এহেন সময়ে ‘ডি সি’ নামক বিদ্যুতের স্থান লইয়াছে ‘এসি’ খ্যাত বিদ্যুৎ। তাহার স্থানে আবার পরিবর্তন। ‘সৌরবিদ্যুৎ’ ধীর ধীরে অন্য সকলকে স্থানান্তরে পাঠাইতেছে। বলয় ভাঙ্গিয়া যাইতেছে। নতুন বলয় গড়িয়া উঠিয়াছে। সম্রাটের বয়স হইয়াছে। চুলে রাজবদ্যি মেহেন্দি বাটিয়া লাগাইয়া দিলেও বয়স আড়াল হইতেছে না। গালে ভাজ দেখা যায়। গলায় অনুশীলিত চর্চার সুর এখন আর মেঘমন্দারের মতো শুনায় না। চোখের উজ্জ্বলতা ক্রমে হ্রাস পাইতেছে। সম্রাট বৃদ্ধ হইলেন। বস্ত্রহরণ কাহার হইয়াছিল? কেন হইয়াছিল?  রাজা উলঙ্গ ছিলেন। কোন এক কবি কবিতাসভায় বলিয়াছিলেন, ‘রাজা তোমার কাপড় কোথায়?’ ( সূত্রঃ হুতমের খাতা। লেখাটি কল্পনাআশ্রিত। কোনও চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোনও সম্পর্ক নেই।)

# # #

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s