ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র নাগরিক অধিকার সকলের আছে।

অনেকগুলি অঙ্গরাজ্য নিয়ে আমাদের দেশের গঠনশৈলী। ভারত নামক দেশটির জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি, রিচুয়াল, খাদ্যাভাস, পোশাক প্রভৃতি বিষয়ের বৈচিত্র আমাদের অহংকার। আমাদের গর্ব। উত্তর পূর্ব ভারতের একটা সময় পর্যন্ত প্রধান রাজ্য ছিল অবিভক্ত বাংলা। স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগের কথা বলতে চাইছি। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা পাওয়ার পরেও পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব খুব একটা কমেনি। উত্তর পূর্ব ভারতের অন্যতম করিডোর হিসবে পশ্চিমবঙ্গকে দেখা হয়ে থাকে। ভারতীয় মানচিত্রে আজও এই অদৃশ্য অঙ্কন, অলিখিতভাবে যার মান্যতা রয়েছে। এবং বলা ভালো মেনে চলা হয়। তাই কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটির ক্ষেত্রে রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র গঠনের পরে প্রথম কয়েক দশক আর্থরাজনৈতিক কারণে এই বাংলার গুরুত্ব কমে গেলেও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য নিয়ে বাংলা তথা ভারতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অসমে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা ‘নাগরিক অধিকার বিষয়ক প্রমাণপত্র’-কে কেন্দ্র করে এই মন্তব্য। ২০১৭ সালের বর্ষশেষের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে উৎকন্ঠা নিয়ে রাত কাটিয়েছে অসমের বাসিন্দারা। বরাক থেকে ব্রহ্মপুত্র জেলার নগর, মহানগর, চর-উপচর, শহর-শহরতলী, পাহাড়-পাহাড়তলীর মানুষ ইংরেজি নতুন বছরের আনন্দ উদযাপনকে আড়ালে রেখে উদ্বেগের সঙ্গে মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থেকেছে। ওদের নজর ছিল সরকারি ওয়েবসাইটে। কারণ জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা ‘এনআরসি’। সংবাদ মাধ্যম সূত্রের খবর রাজ্যে ৩ কোটি ২৯ লক্ষ আবেদনকারী ছিলেন। জাতীয় নাগরিক পঞ্জির খসড়া প্রকাশে রাজ্য বারে বারে সময় পিছোনোয় সুপ্রিম কোর্ট বিরক্ত হয়েই ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে খসড়া প্রকাশের নির্দেশ দেয়।

সংবাদ মাধ্যম সূত্রে আরও খবর, রেজিস্টার জেনারেল অব ইন্ডিয়া শৈলেশ জানিয়েছেন, ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে প্রকাশিত প্রথম খসড়ায় ১ কোটি ৯০ লক্ষের নাম স্থান পেয়েছে। বাকি নাম পরে ঘোষণা হবে। বর্তমান সময়ের মানদণ্ডে অসমে ‘নাগরিক পঞ্জি’-র কাজ কিছুটা করা সম্ভব হয়েছে। ইতিহাস ঘাটলে জানতে পারা যায় ১৯৭১ সালের লোকগননায় জানা যায় আমাদের দেশ ভারতে প্রায় ৩০০০ ভাষা ও উপভাষার সন্ধান পাওয়া গেছে। তথ্যটি এইজন্য উল্লেখ করতে চাইছি, বর্তমান ভারতে ‘ভাষা’ সমস্যা এবং জাতিগত সমস্যা নিয়ে বিতর্ক উত্তরোত্তর বাড়ছে। বিভিন্ন প্রদেশে ‘হিন্দি ভাষা’ বিরোধী পৃথক পৃথক মঞ্চ গড়ে উঠেছে। এই মঞ্চ ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার আগেও ছিল। বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে নতুন মোড়কে আমরা দেখতে পাচ্ছি। পুরনো বক্তব্য একাধিকভাবে উচ্চারিত হয়েছে। ভারত নামক দেশটি আগে একটি পূর্ণাঙ্গ উদার এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত হোক। তারপরে আমরা ‘ভারতীয়’ বলে দাবি করতে পারি। কারণ ভারতে জাতি সমস্যা একটা জ্বলন্ত বিষয়। এই বিষয় নিয়ে বেশী চটকাতে গেলে আখেরে দেশের আর্থিক উন্নয়ন ব্যহত হয়। ভারত একটি ‘বহুজাতিক দেশ’। এই সত্যকে মেনে নিতে হবে তবেই প্রাচীন ভারতের শিকড়ের সন্ধান আমরা করতে পারব। অসমের নাগরিক পঞ্জি বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হতে পারে এই উদ্বেগ থেকেই সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের বক্তব্য রেখেছিলেন। আমরা যদি কিছুটা পিছনের দিকে ফিরে যাই তাহলে দেখতে পাব, ব্রিটিশ ভারতে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত মোট ৯টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। (১) মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সী (২) বোম্বাই প্রেসিডেন্সী (৩) বাঙলা প্রেসিডেন্সী (৪) যুক্ত প্রদেশ (৫) পাঞ্জাব (৬) উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (৭) আসাম (৮) মধ্য প্রদেশ (৯) বিহার ও ওড়িষ্যা। স্বাধীনতার পরে দেশের আর্থরাজনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জাতিসত্তাগুলির বিকাশের ধারাবাহিকতায় ভারতের উল্লেখিত রাজ্যগুলিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার আগে জাতিসত্তাগুলোর আন্দোলনের দুটো ধরণ ছিল। প্রথম ধরণটি ছিল, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিকশিত জাতিসত্তাগুলির সংগঠিত আন্দোলন। ১৮৭০-এর ফাড়কের আন্দোলন এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। দ্বিতীয় ধারাটি ছিল দেশের অবিকশিত জাতিসত্তাগুলোর নেতৃত্বে বিকশিত জাতিসত্তার প্রাধ্যন্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন। উদাহারণ বাংলার বিরুদ্ধে অসমীয়া এবং ওড়িয়াদের পুঞ্জিত ক্ষোভ। তামিল আধিপত্যের বিরুদ্ধে তেলেগু, কানাড়ী ও মালয়ালীদের আন্দোলন ছিল ভারতে অন্যতম জাতিসত্তার আন্দোলন। উল্লেখ করা যায় ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘’………A constitution of separate provinces on a linguistic basis would be undertaken as part of the future scheme of the Govt. of India as soon as the compress has Power to do so and calling up on them mean while to desist from further agitation.’’

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগের সময় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা নামক এক অবৈঞ্জানিক ফর্মুলাকে সামনে রেখে দেশ ভাগ হয়। এর ফলে বাঙালি এবং পাঞ্জাবি জাতির এক ভূখণ্ডের সরল রেখায় আসার পরিবর্তে দুটি পৃথক পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়। যার মূল্য আমাদের আজও চোকাতে হচ্ছে।

আশির দশক থেকে অসমে ‘অ-অসমীয়া’ খেদাও যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই আন্দোলনের পিছনে ধর্ম বর্ণের থেকেও কাজ করছিল উচ্চবিত্ত ‘অ-অসমীয়া’ সম্প্রদায়ের একচেটিয়া শোষণ এবং শাসন। আমি নব্বইয়ের দশকে একাধিকবার অসম রাজ্যে গিয়েছি। অতি নীরবে নিজের যোগ্যতা মতো শান্ত পাহাড়ি মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম খেটে খাওয়া বাঙালিদের ওপর ওদের রাগ বা ক্ষোভ নেই। যত রাগ উচ্চবিত্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপর। যারা ভিন রাজ্য থেকে এসেছে। জাতীয় নাগরিক পঞ্জির কাজ চলার সময় একটি তথ্য উল্লেখ করতে চাইছি। বিতর্ক যদি বাংলাদেশের শরণার্থী বা অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে হয় তবে নিম্নলিখিত তথ্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে। ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি প্রভাতি বাংলা দৈনিকে একটি উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। সেই নিবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘’…………পিতা যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র সারে তিন বছর। তার ২১ বছর পর আমি জনগণের সেবা করার সুযোগ পাই। দুই দশকের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি করি। ভারতের আশ্রয়ে থাকা ৬২, ০০০ শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনি। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার জলবন্টন চুক্তি হয়।‘’

এপর্যন্ত আলোচনায় অসমে ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি’র কাজ চলাকালীন যে বিতর্ক শুরু হয়েছে সেই বিতর্ককে কেন্দ্র করে আম বাঙালিরা কি নিরাপত্তা হিনতায় ভুগছেন? আমরা আরও একটি ঘটনা উল্লেখ করতে পারি। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মে অসমের শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ জন তরুণ তরুণী। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ তথা প্রস্তাবিত ‘বাংলা’ নামক রাজ্যের খেটে খাওয়া মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে খবর আমাদের রাজ্যেও ভিন রাজ্যের অবাঙালি খেটে খাওয়া মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে রানি ভবানী বিদ্যালয়ে কয়েকটি হিন্দিভাষী রাজ্যের মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। কলকাতা এবং কলকাতা সংলগ্ন এলাকায় দিন মজুরির কাজ করেন এমনসব মানুষ সেদিন উপস্থিত ছিলেন ওই দিনের আহুত সভায়। সংগঠন সূত্রের খবর এইসব মানুষেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে রাজ্যে হিন্দিভাষী বিকাশ মঞ্চ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এদিনের সভায় কয়েকজন সংখ্যলঘু সম্প্রদায়ের মানুষও ছিলেন।

একটি সূত্র বলছে অসমে আছে ৬১ শতাংশ বাঙালি অহমীয়া। ২১ শতাংশ চিনা অহমীয়া। অবশিষ্ট ১৮ শতাংশ পাহাড়ের অহমীয়া। এই বিতর্ককে কেন্দ্র করেই যত কান্ড অসমে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল অভিযোগটা কি? অসমে নাগরিক পঞ্জিকরণ প্রক্রিয়ায় নাম নবীকরণে দেড় কোটি মানুষের নাগরিকত্বের প্রশ্ন তুলেছেন। এবং সেই সঙ্গে অসম থেকে বাঙালি বিতাড়নের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। মমতা সোচ্চার হওয়ার পরেই অসমে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নামে অসম বিজেপির নেতৃত্বে এফআইআর করা হয়। অসমের ‘বাঙালি’ এমন একটি ইস্যু আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর তোলা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের বিরোধী দলগুলি মহা সমস্যায় পড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখিত প্রশ্নে মমতার বিরোধিতা করা মানে বাঙালি সমাজের বিরোধিতা করা। তাই সংসদে শীতকালীন অধিবেশন চলার সময় বিষয়টি নিয়ে একযোগে সরব হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সাংসদরা। এই রাজ্যের বিজেপিও পড়েছে দোটানায়। অনেকটা গোরখল্যান্ড ইস্যুর মতো। রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব সে কথা দিল্লির নেতৃত্বকে জানিয়েও দিয়েছে। সম্প্রতি সিপিএম সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখরক্ষার জন্য একটি পুরনো প্রসঙ্গ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইছে। সিপিএম লিখছে,

‘’মমতা হঠাৎ আসামের নাগরিকত্ব তালিকা নিয়ে বাজার গরম করতে আসরে নেমেছেন। ২০০৩ সালে এনডিএ সরকার আনীত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন-২০০৩ যখন লোকসভায় পাশ হয়েছিল, তা মমতা ব্যানার্জী শুধু সমর্থনই করেন নি, তিনি এই আইন দ্রুত কার্যকরী করারও দাবি জানিয়েছিলেন। আবার ২০০৫ সালে ইউপিএ সরকারের সময় বাংলাদেশ থেকে বেআইনী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলতে না দেওয়ার জন্য তিনি সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ পেশের নাটকও করেছিলেন।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে মমতা ব্যানার্জী ২০০৫ সালের ৪ঠা আগস্ট লোকসভার ওয়েলে নেমে উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ সিং অটোয়ালের দিকে কাগজ ছুঁড়ে মারছেন। মমতা ব্যানার্জীর অজুহাত ছিল : ‘বাংলাদেশ থেকে বেআইনী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি’ উত্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। এরপর তিনি উপাধ্যক্ষকে উদ্দেশ্যে লেখা সাংসদ পদ থেকে একটি পদত্যাগপত্র অন্যের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। মমতা ব্যানার্জী ভাল করেই জানতেন যে, উপাধ্যক্ষকে উদ্দেশ্য করে লেখা পদত্যাগপত্র অন্যের মাধ্যমে পাঠালে তা বাতিল হয়ে যাবে। পদত্যাগপত্র অধ্যক্ষকে উদ্দেশ্য করে নিজে গিয়ে জমা দিতে হয়। জেনেশুনে তিনি পদত্যাগের নাটক করেছিলেন।

২০০৩ সালে আইন পাশের সময় আদবানির পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন করে আজ মমতা উল্টো কথা বলছেন।  (সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত, মানুষের সাথে সিপিএম, ৮ জানুয়ারি, ২০১৮)’’

তৃণমূল কংগ্রেস এর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় অসম সিপিএম রাজ্য কমিটির একটি বিবৃতি প্রকাশ করে দাবি করেছিল তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্যকে সঠিকভাবে প্রচার করছে না অসমের বামপন্থীরা। তৃণমূলের সেই বক্তব্যের পালটা হিসেবে সম্ভবত সিপিএমের এই পোস্ট।

৩১ ডিসেম্বর অসমের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ‘’১৯৫১ সালের পরে ভারতে এই প্রথম কোনও রাজ্য এনআরসি নবীকরণে হাত দিয়েছে। তাই কী ভাবে কাজ চলবে তার আগাম অভিঞ্জতা কারও ছিল না। কাজ করতে করতেই শিখেছেন ৪০ হাজার কর্মী। ভিন রাজ্য থেকে লিগ্যাসি ডেটা যাচাইয়ের সমস্যা হয়েছে। বাড়ি গিয়ে আবেদনপত্র যাচাই ছিল সময় সাপেক্ষ কাজ।‘’

এর পরেও কিন্তু রাজ্যের মানুষের উৎকণ্ঠা থেকেই যাচ্ছে। কংগ্রেস বলছে, ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি’-এর প্রথম তালিকা প্রকাশের পরে উৎকণ্ঠা ব্রহ্মপুত্রের চেয়ে বরাক উপত্যকায় বেশি। কারণ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে উপজাতি এবং চা শ্রমিকদের সুপ্রিম কোর্ট আদি বাসিন্দা হিসেবে আগেই জানিয়ে দিয়েছে।

অসমে ‘জাতিয় নাগরিক পঞ্জি’ নিয়ে রাজনীতি না করাটাই ভালো বলে মনে হয়। মমতা বন্দ্যোপাধায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সকলেই বলবে রাজ্যের কোনও বৈধ নাগরিককে যেন তাড়িয়ে দেওয়া না হয়। সেটা বাঙালি সম্প্রদায়ের হোক অথবা অ-অসমীয়া অন্য যে কোনও সম্প্রদায়ের। অবহেলিত উত্তর পূর্ব ভারতের উন্নয়নের জন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ‘লুক ইস্ট’ নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। আর্থ সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলটির করিডোর হচ্ছে আমাদের বাংলা। তাই পশ্চিমবঙ্গকে দায়িত্ব নিতে হবে সমস্ত রাজনীতির উর্ধে উঠে অসমের সঙ্গে সহযোগিতা করার। যাতে আগামী দিনে ভারত নামক একটি বৃহত্তর গণতন্ত্র আরও উন্নয়নের নিরিখে এশিয়ায় প্রথম সারিতে আসতে পারে। সহিষ্ণু ভারতের রক্ষাকবচ হাতে নিয়ে।

 

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

মানবতার পক্ষে আছি অধর্মে নেই জিরাফেও নেই

প্রকৃতি তোমার চিরনন্দিত অপরূপ শোভা তুমি কেন লুকিয়ে রাখতে পার না? অতি সাধারণ জীবনের যেটুকু অভিঞ্জতা হয়েছে, যৌবনের বিহান বেলায় প্রথম চোখের ভাষায় বিহার, ঝাড়খন্ড, অসম, ওড়িশা, মেঘালয় এই কয়েকটি পাহাড়তলীর রাজ্য একসময় দেখেছি। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, লঝমন ঝোলা, হরিদ্বার দেখেছি। আহা কি সে অপরূপ সৌন্দর্য। অকৃপণ সবুজের মায়াময়তায়, মেঘতলির সদাহাস্য কুঠুরি খুলে বসে আছে অচেনা এক নিষ্পাপ কুমারী নারী। অতি সন্তর্পণে ছুঁয়ে বলে আমি তোমার সেই মেয়ে। এসো আমাকে আলিঙ্গন করো। পাশে ঝোরা আছে। নদী আছে, গঙ্গা আছে। ছুঁয়ে যাও আমাকে, সব কলঙ্ক পাপ ধুয়ে যাবে। আমি আজ তোমার প্রেমিকা হব। ভালোবাসার পাহারি জংলা রঙের ভেলা নিয়ে বসে আছি। কত রঙের প্রজাপতি উড়ছে দ্যাখ আকাশে বাতাসে। রঙিন প্রজাপতি গাছের পাতায় পাতায় ঘুরছে নব যৌবনের বাতায়ন খুলে। গাছের ডাল, পাতা, ফুলের রেণু নিঙরে প্রাগে পরাগে সম্মেলনের কবিতার চরণ লেখে। পয়ার ছন্দে। প্রেম এসে ফিরে যায় একাকি গহন বনে। এসো তুমি জলে জঙ্গলে। বলো, হে বন্য নারী আজ আমি তোমার প্রেমে তৃপ্ত। পাত্র উজাড় করে ভরিয়ে দাও আমায়। আহ্বান করে অচেনা বন্য সুন্দরী তনয়া যেন বলছে, তুমি পুরুষ, তোমার ক্লান্ত শ্রান্ত ঘর্মাক্ত শরীর দেখলে আমার নারীত্ব আমাকে আরও শান্ত করে রাখে। আমার ঘৌমটা খুলে অদেখা সুন্দরকে উজ্জ্বল করো। প্রজ্বলিত করো। অদেখা অচেনা সুন্দরের কাছে আজ তোমাকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। আমি তোমার সেই বন্য নারী।

সপ্ততরীর ঢেউ ভাঙা অকৃত্রিম মেঘমল্লারের নৃত্যে ‘তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ’ ছন্দে রাজপ্রাসাদের রাজকীয়তা নিয়ে ডেকে পাঠাও সকলকে। সবুজ বৃক্ষরাশি কখনও বৈশাখী ঝঞ্ঝায়, কাল বৈশাখীর উথাল পাথাল আন্দোলনে প্রলয়ের বড় গল্প শোনায়। অবিরাম বৃষ্টি শেষে ‘টুপ টুপ, টুপ টুপ’ পাহাড়ি ঝোরার চেনা অচেনা খিল খিল হাসি। কে একজন প্রশ্ন করে ‘এ বাবু হেথাকে কখন এলি?’ শরতের এলোমেলো মেঘ সাদা সাদা বকেদের ডানায় ডানায় আবার সে ফিরে ফিরে আসে, ছোট নাগপুরের আদিবাসী গ্রামের ‘আরণ্যক’ উপাখ্যানের বহু বর্ণনায়। হে আমার অচেনা প্রকৃতি তোমার প্রলয় রুদ্র মুরতি সৃষ্টির বন্ধন ভেঙ্গে আগুনে পোড়া মানবতা ছুঁয়ে যায়।

যে আকাশে বাদলের গান শুনি সেই আকাশে সাদা কালো, লাল নীল, হাজারো রঙের পাখ পাখালির কলরব। চেনা অচেনা আকাশেও দবন্দ থাকে, অসীম আদিগন্ত কালো মেঘেদের অন্তরালে অবিরাম আকাশ দখলের সচেষ্ট অভিলাষ থাকে। ওরা পক্ষীরাজের দেশের ভাষায় কথা বলে। এতবড় আকাশ, প্রকৃতি সেও তোমার স্বপ্ন দেখানো ঘুম ভাঙা ভোরের দিগন্ত বলয়। এই বলয়ে পাখিদের দবান্দিক অবলোকন আহ্বান করে দেশ বিদেশের পরিযায়ী পাখিদের। সাগরের চরাচরে, নদীর বালুকা বেলায়, হ্রদের শীতল উষ্ণতায় পরিযায়ী পাখি অক্লান্ত যাত্রা পথে অধর্মকে শাসন করে মানবতার চড়ুইভাতির আনন্দে। পটুয়া শিল্পীর গ্রাম্যপটে ছবি হয়ে উড়ে বেড়ায় তাঁরা। বলে আমরা আকাশেও আছি, মাটিতেও আছি, তোমার আঙিনায় থাকব। এই জগৎসভায় পরিক্রমা করতে করতে বারে বারে বলি জিরাফের পীঠে বসতে চাইনা। হাঁটব জিরাফের পথরেখায়। গ্রাম্য পটুয়ার আঁকা আলভাঙা সড়কের পল্লবিত পক্ষীবালিকার নূপুরের তালে তালে। বলব অধর্মে নেই মানবতায় আছি।

সেদিন অনেকদিন পর এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বইপাড়ায় গিয়েছিলাম। পরিযায়ী পাখিদের মত ঘুরতে ঘুরতে যাযাবর জীবনটা চিনতে কলকাতার প্রাচীন বৃক্ষরাশির ছায়াতলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অতীতের কথকতা, স্মৃতি, ভাঙা ভাঙা ছন্দে হাঁটি হাঁটি এসে আলিঙ্গন করছে। আমি উদাস চাউনিতে হেরিতেছি ক্লান্ত, পথভ্রস্ট আহত কবুতরের মতো। কলেজস্কয়ারের পূর্বদিকের গেটের সামনে তখন কিছু লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে কিছু একটা দেখছে। ভিড় দেখলেই যেমন আম বাঙালি ভিরে যায়। দেহাতী বাঙালিদের মতো আমিও গলা ঢুকিয়ে দিলাম। ভিড়ের গলতা দিয়ে দেখলাম আমাদের সমবয়সি একজন লোক হাতে একটা আড়াই ফুট লম্বা পুতুল নিয়ে কি সব দেখাচ্ছে। পুতুলটা পুরনো নতুন কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো সেলাই করে তৈরি করা হয়েছে। পুতুলের পোশাকে বোঝা গেল পুতুলটি পুরুষ চরিত্র। জিনসের প্যান্ট। দুটো পকেট দেওয়া জলপাই রঙের জামা। জামার একটা পকেটে ভারতের ‘জাতীয় পতাকা’-এর স্টীকার আলাদভাবে সেলাই করা আছে। কোমরে চওড়া চকলেট রঙের বেল্ট। পুতুলের মুখটায় সার্কাসের ‘জোকার’-এর মতো করে রাঙানো। যে লোকটা পুতুলটা ধরে আছে তাঁর বাবরি চুল। পেল্লাই বড় এক দাড়ি। পোশাক পড়ে আছে সেও এক বিচিত্র। গায়ে পুরনো দিনের বাঙলা সার্ট। গায়ক হেমন্তবাবুরা যেমন সার্ট ব্যবহার করতেন। ঢোলা পায়জামা। পায়ে কাঠের খড়ম। লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা লাঠিতে বাঁধা একটা প্ল্যাকার্ড ধরে আছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মানবতায় আছি, অধর্মে নেই জিরাফেও নেই’। নীচে ছোট করে লেখা ‘তিরপিতা’। বুঝলাম ‘তিরপিতা’ মানে গোষ্ঠীর নাম।

লোকটা বলছে, ‘এই দ্যাখেন দাদা, দিদিরা এই পুতুলটো এখনও অর দ্যাশের ভাষায় দশের ভাষায় কথা বুলে। ইটো পুতুল নাচের ইতিকথা লয়। আমি মানিকবাবুর ভাষায় কথা বলতে পারিয়ে না। আমার পুতুল কি বুলছে আপনারা শুনেন।’

লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমাহার বাড়ি কুথায়?’

‘ওই তিরপিতা গাঁয়ে। কাঠ ব্যবসায়ী হর্ষবাবুদের পাড়ায়।’ পুতুল উত্তর দিল।

লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমহার লিখা পড়া কতদূর?’

‘আঞ্জে বিপিএল কার্ড নাইখো। পঞ্চায়েতে বাবুরা বুললে বিপিএল কার্ড না থাকলে স্কুলে পড়া চলবে না। আমি বুললাম আমার বাপের বিদ্যাসাগর ছিল না আমাহার ‘বিপিএল কার্ড’ লায় বাবু। আর স্কুলে লিলে না।’

‘আচ্ছা গোবরা তুমি এখন কি কাজ কর?’

‘কাজ কুন্ঠি পাব? আমি বামুন-কায়েত, সদগোপ চাষির ছেলা যে আমাকে কাজ দিবে? আবার দ্যখেন আহমি সিডিউল কাস্ট লই। দলিতও লই। বাপের পদবী ছিল ‘মাল’। তবে আমার বাপ একদম মাল চিনতে শিখেনি। ওই লেগি আমার এই হাল হুলো কাকা। একশো দিনের মাটি কাটার কাজেও কেউ লিছে না। আমাকে কাজ দিলে আমি নাকি ‘পুকুর চুরি’-এর কথা সবাইকে রসিয়ে রসিয়ে বুলি দিব?’ এই কথা কি ঠিক? আপনি বুলেনতো কাকা? আমি কি পঞ্জজনের ঢুলি? ধান্দা আমিও বুঝি। মাগ্যিগণ্ডার দ্যাশে পাঁচ দশ টাকা কমিশন সব্বাই খেছে।

‘আমাকে আজ কাকা বলছ ক্যানে? ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি কাজ না করলে সারাদিনের খাওয়া খরচ, বাড়ি ঘর মেরামতির টাকা, চিকিৎসার খরচ এইসব কুথা থেকি পেছ?’

‘ এই যে আপনার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছি। পাঁচটো কথা বুলছি। সাপের পাঁচ পা দেখার কথা লয়। ওই আপনার মতো বাবুদের কথা। সেই কথা শুনি গাঁ গঞ্জের দাদা দিদিরা আনন্দ পেছে। তারপর অরা যা দিছে তার ভাগ আমাকে কিছু দিছেন আপনি মামা। তবে কিনা ফাউল করছেন আপুনি।’

‘তুমি গোবরা একবার ‘কাকা’ বুলছ, একবার ‘মামা’ বুলছ ক্যানে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আর ফাউল কি করলাম?’

‘আপনি বুলাছিলেন আপনার একশো টাকা আয় হলে তিরিশ টাকা আমাকে দিবেন। একশো তিরিশ টাকা আয় হলেও তিরিশ টাকা আহমাকে দিবেন। আপনি কি করছেন? আমাকে তিরিশ টাকা দিছেন আপনি? ১২ টাকা দিছেন। তবে ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে ১২ টাকা পেছি। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট করি দিয়াছেন। আর ১৮ টাকা ভাউচার লিখে ছিঁড়ে দিছেন, ভাউচার ছিঁড়ে দিছেন। ১৮ টাকা আপনি পকেটে পুরছেন। ইটো ফাউল লয় জামাইবাবু? পিএফ দিছেন না, ইএসাই করি দেননি। তবু আহমার এক চোখ লিং আপনার সাথে কাজ করছি। এই গুলান ফাউল লয় জামাইবাবু?’

‘সে না বুঝলাম, তা এতসব মেনে লিং আমার সঙ্গে কাজ করছ ক্যানে শালো?’

‘এইবার ঠিক বুল্লেন, কলকাতার যে খানে যেছি সবখানে আপনাদের লোক। আমার বা দিকে দ্যাখেন যে লোকগুলান বসি আছে ওইখানে আপনার মতো জামাইবাবু অনেক পাবেন। আবার ডান দিকে দ্যাখেন ওইখানে মামা,কাকাদের দল পাবেন জামাইবাবু।’

এতক্ষণ যে সব কোতুহলী মানুষ ‘পুতুলের কথা’ শুনছিল তাঁরা অনেকেই বিছিয়ে দেওয়া চাদরে পাঁচ টাকা, দশ টাকার নোট, একটাকা দুটাকা, পাঁচ টাকার কয়েন ফেলছিল। এদের মধ্যে থেকে একজন বলে ফেলল ‘এই যে পুতুলের মালিক তুমিও বাংলার বাইরের ব্যবসা শিখে গেছ বস?’

ভিড় পাতলা হতে থাকে। মালিক ধমক দিয়ে পুতুলকে বলে, ‘কি সব বুলছ তুমি আজ গোবর? এবার কি করবে? ভিড় যে পাতলা হুং গেল?’

‘আঞ্জে কি আর করব? হর্ষবাবু বুলাছিল কলকাতার সব রাস্তা থিকা চেতলা যাওয়ার ৩৩ নম্বর দোতলা বাস পাওয়া যায়। আমি ইবার ওই বাস ধরি ‘নবান্ন’ দেখতি যাব। পুলিশবাবুরা ভিতরে ঢুকতে দিলে পঞ্চুকাকুকে বুলব আহমাকে তিনটা কার্ড দেন। একটো ‘সিডিউল কাস্ট’ কার্ড, একটো কাজ পাওয়ার জব কার্ড আর একটো ‘হেলথ কার্ড’। আমার চোখে ‘ন্যাবা’ হলছে।’

পুতুলের মালিক এরপর আর কথা না বাড়িয়ে গোবরকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তখনও দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের উদ্দেশ্যে বলল, ‘গোবরের শরীরটা ভালো নেই। আজ ওকে একটু বিশ্রাম দিন। আবার একদিন আমরা ওর কথা শুনব।’

Leave a comment

Filed under Uncategorized

মানবতার পক্ষে আছি অধর্মে নেই জিরাফেও নেই

প্রকৃতি তোমার চিরনন্দিত অপরূপ শোভা তুমি কেন লুকিয়ে রাখতে পার না? অতি সাধারণ জীবনের যেটুকু অভিঞ্জতা হয়েছে, যৌবনের বিহান বেলায় প্রথম চোখের ভাষায় বিহার, ঝাড়খন্ড, অসম, ওড়িশা, মেঘালয় এই কয়েকটি পাহাড়তলীর রাজ্য একসময় দেখেছি। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, লঝমন ঝোলা, হরিদ্বার দেখেছি। আহা কি সে অপরূপ সৌন্দর্য। অকৃপণ সবুজের মায়াময়তায়, মেঘতলির সদাহাস্য কুঠুরি খুলে বসে আছে অচেনা এক নিষ্পাপ কুমারী নারী। অতি সন্তর্পণে ছুঁয়ে বলে আমি তোমার সেই মেয়ে। এসো আমাকে আলিঙ্গন করো। পাশে ঝোরা আছে। নদী আছে, গঙ্গা আছে। ছুঁয়ে যাও আমাকে, সব কলঙ্ক পাপ ধুয়ে যাবে। আমি আজ তোমার প্রেমিকা হব। ভালোবাসার পাহারি জংলা রঙের ভেলা নিয়ে বসে আছি। কত রঙের প্রজাপতি উড়ছে দ্যাখ আকাশে বাতাসে। রঙিন প্রজাপতি গাছের পাতায় পাতায় ঘুরছে নব যৌবনের বাতায়ন খুলে। গাছের ডাল, পাতা, ফুলের রেণু নিঙরে প্রাগে পরাগে সম্মেলনের কবিতার চরণ লেখে। পয়ার ছন্দে। প্রেম এসে ফিরে যায় একাকি গহন বনে। এসো তুমি জলে জঙ্গলে। বলো, হে বন্য নারী আজ আমি তোমার প্রেমে তৃপ্ত। পাত্র উজাড় করে ভরিয়ে দাও আমায়। আহ্বান করে অচেনা বন্য সুন্দরী তনয়া যেন বলছে, তুমি পুরুষ, তোমার ক্লান্ত শ্রান্ত ঘর্মাক্ত শরীর দেখলে আমার নারীত্ব আমাকে আরও শান্ত করে রাখে। আমার ঘৌমটা খুলে অদেখা সুন্দরকে উজ্জ্বল করো। প্রজ্বলিত করো। অদেখা অচেনা সুন্দরের কাছে আজ তোমাকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। আমি তোমার সেই বন্য নারী।

সপ্ততরীর ঢেউ ভাঙা অকৃত্রিম মেঘমল্লারের নৃত্যে ‘তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ’ ছন্দে রাজপ্রাসাদের রাজকীয়তা নিয়ে ডেকে পাঠাও সকলকে। সবুজ বৃক্ষরাশি কখনও বৈশাখী ঝঞ্ঝায়, কাল বৈশাখীর উথাল পাথাল আন্দোলনে প্রলয়ের বড় গল্প শোনায়। অবিরাম বৃষ্টি শেষে ‘টুপ টুপ, টুপ টুপ’ পাহাড়ি ঝোরার চেনা অচেনা খিল খিল হাসি। কে একজন প্রশ্ন করে ‘এ বাবু হেথাকে কখন এলি?’ শরতের এলোমেলো মেঘ সাদা সাদা বকেদের ডানায় ডানায় আবার সে ফিরে ফিরে আসে, ছোট নাগপুরের আদিবাসী গ্রামের ‘আরণ্যক’ উপাখ্যানের বহু বর্ণনায়। হে আমার অচেনা প্রকৃতি তোমার প্রলয় রুদ্র মুরতি সৃষ্টির বন্ধন ভেঙ্গে আগুনে পোড়া মানবতা ছুঁয়ে যায়।

যে আকাশে বাদলের গান শুনি সেই আকাশে সাদা কালো, লাল নীল, হাজারো রঙের পাখ পাখালির কলরব। চেনা অচেনা আকাশেও দবন্দ থাকে, অসীম আদিগন্ত কালো মেঘেদের অন্তরালে অবিরাম আকাশ দখলের সচেষ্ট অভিলাষ থাকে। ওরা পক্ষীরাজের দেশের ভাষায় কথা বলে। এতবড় আকাশ, প্রকৃতি সেও তোমার স্বপ্ন দেখানো ঘুম ভাঙা ভোরের দিগন্ত বলয়। এই বলয়ে পাখিদের দবান্দিক অবলোকন আহ্বান করে দেশ বিদেশের পরিযায়ী পাখিদের। সাগরের চরাচরে, নদীর বালুকা বেলায়, হ্রদের শীতল উষ্ণতায় পরিযায়ী পাখি অক্লান্ত যাত্রা পথে অধর্মকে শাসন করে মানবতার চড়ুইভাতির আনন্দে। পটুয়া শিল্পীর গ্রাম্যপটে ছবি হয়ে উড়ে বেড়ায় তাঁরা। বলে আমরা আকাশেও আছি, মাটিতেও আছি, তোমার আঙিনায় থাকব। এই জগৎসভায় পরিক্রমা করতে করতে বারে বারে বলি জিরাফের পীঠে বসতে চাইনা। হাঁটব জিরাফের পথরেখায়। গ্রাম্য পটুয়ার আঁকা আলভাঙা সড়কের পল্লবিত পক্ষীবালিকার নূপুরের তালে তালে। বলব অধর্মে নেই মানবতায় আছি।

সেদিন অনেকদিন পর এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বইপাড়ায় গিয়েছিলাম। পরিযায়ী পাখিদের মত ঘুরতে ঘুরতে যাযাবর জীবনটা চিনতে কলকাতার প্রাচীন বৃক্ষরাশির ছায়াতলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অতীতের কথকতা, স্মৃতি, ভাঙা ভাঙা ছন্দে হাঁটি হাঁটি এসে আলিঙ্গন করছে। আমি উদাস চাউনিতে হেরিতেছি ক্লান্ত, পথভ্রস্ট আহত কবুতরের মতো। কলেজস্কয়ারের পূর্বদিকের গেটের সামনে তখন কিছু লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে কিছু একটা দেখছে। ভিড় দেখলেই যেমন আম বাঙালি ভিরে যায়। দেহাতী বাঙালিদের মতো আমিও গলা ঢুকিয়ে দিলাম। ভিড়ের গলতা দিয়ে দেখলাম আমাদের সমবয়সি একজন লোক হাতে একটা আড়াই ফুট লম্বা পুতুল নিয়ে কি সব দেখাচ্ছে। পুতুলটা পুরনো নতুন কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো সেলাই করে তৈরি করা হয়েছে। পুতুলের পোশাকে বোঝা গেল পুতুলটি পুরুষ চরিত্র। জিনসের প্যান্ট। দুটো পকেট দেওয়া জলপাই রঙের জামা। জামার একটা পকেটে ভারতের ‘জাতীয় পতাকা’-এর স্টীকার আলাদভাবে সেলাই করা আছে। কোমরে চওড়া চকলেট রঙের বেল্ট। পুতুলের মুখটায় সার্কাসের ‘জোকার’-এর মতো করে রাঙানো। যে লোকটা পুতুলটা ধরে আছে তাঁর বাবরি চুল। পেল্লাই বড় এক দাড়ি। পোশাক পড়ে আছে সেও এক বিচিত্র। গায়ে পুরনো দিনের বাঙলা সার্ট। গায়ক হেমন্তবাবুরা যেমন সার্ট ব্যবহার করতেন। ঢোলা পায়জামা। পায়ে কাঠের খড়ম। লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা লাঠিতে বাঁধা একটা প্ল্যাকার্ড ধরে আছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মানবতায় আছি, অধর্মে নেই জিরাফেও নেই’। নীচে ছোট করে লেখা ‘তিরপিতা’। বুঝলাম ‘তিরপিতা’ মানে গোষ্ঠীর নাম।

লোকটা বলছে, ‘এই দ্যাখেন দাদা, দিদিরা এই পুতুলটো এখনও অর দ্যাশের ভাষায় দশের ভাষায় কথা বুলে। ইটো পুতুল নাচের ইতিকথা লয়। আমি মানিকবাবুর ভাষায় কথা বলতে পারিয়ে না। আমার পুতুল কি বুলছে আপনারা শুনেন।’

লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমাহার বাড়ি কুথায়?’

‘ওই তিরপিতা গাঁয়ে। কাঠ ব্যবসায়ী হর্ষবাবুদের পাড়ায়।’ পুতুল উত্তর দিল।

লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমহার লিখা পড়া কতদূর?’

‘আঞ্জে বিপিএল কার্ড নাইখো। পঞ্চায়েতে বাবুরা বুললে বিপিএল কার্ড না থাকলে স্কুলে পড়া চলবে না। আমি বুললাম আমার বাপের বিদ্যাসাগর ছিল না আমাহার ‘বিপিএল কার্ড’ লায় বাবু। আর স্কুলে লিলে না।’

‘আচ্ছা গোবরা তুমি এখন কি কাজ কর?’

‘কাজ কুন্ঠি পাব? আমি বামুন-কায়েত, সদগোপ চাষির ছেলা যে আমাকে কাজ দিবে? আবার দ্যখেন আহমি সিডিউল কাস্ট লই। দলিতও লই। বাপের পদবী ছিল ‘মাল’। তবে আমার বাপ একদম মাল চিনতে শিখেনি। ওই লেগি আমার এই হাল হুলো কাকা। একশো দিনের মাটি কাটার কাজেও কেউ লিছে না। আমাকে কাজ দিলে আমি নাকি ‘পুকুর চুরি’-এর কথা সবাইকে রসিয়ে রসিয়ে বুলি দিব?’ এই কথা কি ঠিক? আপনি বুলেনতো কাকা? আমি কি পঞ্জজনের ঢুলি? ধান্দা আমিও বুঝি। মাগ্যিগণ্ডার দ্যাশে পাঁচ দশ টাকা কমিশন সব্বাই খেছে।

‘আমাকে আজ কাকা বলছ ক্যানে? ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি কাজ না করলে সারাদিনের খাওয়া খরচ, বাড়ি ঘর মেরামতির টাকা, চিকিৎসার খরচ এইসব কুথা থেকি পেছ?’

‘ এই যে আপনার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছি। পাঁচটো কথা বুলছি। সাপের পাঁচ পা দেখার কথা লয়। ওই আপনার মতো বাবুদের কথা। সেই কথা শুনি গাঁ গঞ্জের দাদা দিদিরা আনন্দ পেছে। তারপর অরা যা দিছে তার ভাগ আমাকে কিছু দিছেন আপনি মামা। তবে কিনা ফাউল করছেন আপুনি।’

‘তুমি গোবরা একবার ‘কাকা’ বুলছ, একবার ‘মামা’ বুলছ ক্যানে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আর ফাউল কি করলাম?’

‘আপনি বুলাছিলেন আপনার একশো টাকা আয় হলে তিরিশ টাকা আমাকে দিবেন। একশো তিরিশ টাকা আয় হলেও তিরিশ টাকা আহমাকে দিবেন। আপনি কি করছেন? আমাকে তিরিশ টাকা দিছেন আপনি? ১২ টাকা দিছেন। তবে ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে ১২ টাকা পেছি। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট করি দিয়াছেন। আর ১৮ টাকা ভাউচার লিখে ছিঁড়ে দিছেন, ভাউচার ছিঁড়ে দিছেন। ১৮ টাকা আপনি পকেটে পুরছেন। ইটো ফাউল লয় জামাইবাবু? পিএফ দিছেন না, ইএসাই করি দেননি। তবু আহমার এক চোখ লিং আপনার সাথে কাজ করছি। এই গুলান ফাউল লয় জামাইবাবু?’

‘সে না বুঝলাম, তা এতসব মেনে লিং আমার সঙ্গে কাজ করছ ক্যানে শালো?’

‘এইবার ঠিক বুল্লেন, কলকাতার যে খানে যেছি সবখানে আপনাদের লোক। আমার বা দিকে দ্যাখেন যে লোকগুলান বসি আছে ওইখানে আপনার মতো জামাইবাবু অনেক পাবেন। আবার ডান দিকে দ্যাখেন ওইখানে মামা,কাকাদের দল পাবেন জামাইবাবু।’

এতক্ষণ যে সব কোতুহলী মানুষ ‘পুতুলের কথা’ শুনছিল তাঁরা অনেকেই বিছিয়ে দেওয়া চাদরে পাঁচ টাকা, দশ টাকার নোট, একটাকা দুটাকা, পাঁচ টাকার কয়েন ফেলছিল। এদের মধ্যে থেকে একজন বলে ফেলল ‘এই যে পুতুলের মালিক তুমিও বাংলার বাইরের ব্যবসা শিখে গেছ বস?’

ভিড় পাতলা হতে থাকে। মালিক ধমক দিয়ে পুতুলকে বলে, ‘কি সব বুলছ তুমি আজ গোবর? এবার কি করবে? ভিড় যে পাতলা হুং গেল?’

‘আঞ্জে কি আর করব? হর্ষবাবু বুলাছিল কলকাতার সব রাস্তা থিকা চেতলা যাওয়ার ৩৩ নম্বর দোতলা বাস পাওয়া যায়। আমি ইবার ওই বাস ধরি ‘নবান্ন’ দেখতি যাব। পুলিশবাবুরা ভিতরে ঢুকতে দিলে পঞ্চুকাকুকে বুলব আহমাকে তিনটা কার্ড দেন। একটো ‘সিডিউল কাস্ট’ কার্ড, একটো কাজ পাওয়ার জব কার্ড আর একটো ‘হেলথ কার্ড’। আমার চোখে ‘ন্যাবা’ হলছে।’

পুতুলের মালিক এরপর আর কথা না বাড়িয়ে গোবরকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তখনও দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের উদ্দেশ্যে বলল, ‘গোবরের শরীরটা ভালো নেই। আজ ওকে একটু বিশ্রাম দিন। আবার একদিন আমরা ওর কথা শুনব।’

Leave a comment

Filed under Uncategorized

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের জাগরণের মঞ্চ বর্তমান শতাব্দীতেও আলোকিত

লেখার বিষয়টা মাথায় এসেছিল এই বছরের নভেম্বর মাসে। ৫ নভেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি সেদিন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জন্মদিন। ইচ্ছেটা সেদিন থেকেই চাগিয়ে উঠেছিল। নিজের সীমাবদ্ধতায় কয়েকটি বিষয় পড়ে ফেললাম। সেটা অবশ্যই ‘দেশবন্ধু’ বিষয়ক এবং অন্যান্য। কিন্তু ভাবলেইতো হয় না। সময় একটা ব্যাপার। প্রস্তুতি যখন নিচ্ছি হঠাৎ আমন্ত্রণ পেলাম কলকাতার আলিয়াঁস ফ্রাঁসেজ থেকে। ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠান ছিল আলিয়াঁ ফ্রাঁসেজ সভাঘরে। সেদিনের অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘’Exploring the Human Condition A Talk on the French Moralists of the 17th Century.‘’ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ফরাসিবিদ চিন্ময় গুহ বললেন সতেরো শতকের কয়েকজন দার্শনিক ও মরালিস্ত সম্পর্কে। এদিন অধ্যাপক গুহ বেছে নিয়েছিলেন ব্লেজ পাসকাল, লা ব্রুযইয়ের এবং লা রোশফুকো।

বিশ্বের দুই মহাদেশের ভিন্ন সংস্কৃতির দুটি মহান দেশের মহান দার্শনিক এবং চিন্তাবিদদের নিয়ে আমার কিছু লেখার অধিকার বা যোগ্যতা আছে কিনা আমি নিজেই সন্দিহান। বামনের চাঁদ ধরার কৌতূহল। দর্শন, ঞ্জান, গণিত, বিঞ্জান, সাহিত্য, কবিতার মেঘলা আকাশ, ঝর ঝর বাদলবেলা, ইলশেগুড়ি বৃষ্টি বা বরফের মতো শব্দ, প্রখর গ্রীস্মের খট খটে মরুভূমিতে শব্দের জ্যোৎস্নামাখা কাব্য সেদিন শুনেছিলাম। অধ্যাপক চিন্ময় গুহ শুরুই করলেন, ‘’Some French thinkers they have doubt about knowledge.‘’  আমি কি জানি? Michel de Mantaigne (1533-1592).

সপ্তদশ শতাব্দীর দার্শনিক বলছেন আমি কি জানি? আমি কি করব? আমিতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। জীবনে কিছু করতে পারছি না। শুধু অন্ধকার দেখছি। অধ্যপাক গুহ বললেন, ‘Look at the self search. Look at the doubt. He wrote 3 book essays, 107 chapters.  আমি কে? এটাই প্রশ্ন। ফরাসী রেনেসাঁর’।

Blais Pascal (1623-1663) Mathematician, Physicist- বাঙালি ফরাসি বিষেশঞ্জ চিন্ময় গুহ বলছেন, ‘’তুচ্ছ জিনিষ আমাদের শান্তনা দেয়। এই ব্যক্তি অলঙ্কারকে বর্জন করেছেন। পান্ডিত্যকে পরিহার করতে চেয়েছেন। মানুষের কাছে পৌঁছতে চেয়েছেন। কখনো মনে হয়েছে তিনি একজন মনস্তত্ববিদ। মানুষকে শান্তনা দিয়েছেন। সত্যকে খুঁজে পাননি। তিনি খুঁজছেন। I am not looking at solution. সকলকে আক্রমণ করছেন। শুধুমাত্র নাস্তিকদের নয়। ধর্মীয়দেরও আক্রমণ করছেন। সব ভেঙ্গেচুড়ে দিচ্ছেন। মানুষকে বোঝার জন্য পাসকাল দীর্ঘ সময় নিয়েছেন। প্রচন্ড একটা নাড়া দেয়। বুঝতে পারছি না বলে নয়। যুক্তির অতীত একটা আছে।‘’ লা ব্রুযইয়ের সম্পর্কে বলার সময় অধ্যাপক গুহ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন ফরাসি রেনেসাঁর পর এই দার্শনিকের মতো সূক্ষ্মতা আর কারও ছিল না।

Jean la Bruye`re (1645-1696)- Philosopher and Moralist,  চিন্ময় গুহের কথায়, ‘অধিকাংশ লোক তাঁর প্রধান অংশ ব্যয় করে অধিকাংশ মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তুলতে। অন্যদের খুশি করা শক্ত।’ সপ্তদশ শতাব্দীতে বলছেন তিনি। আমরা কেন হাসছি? কারণ আমরা Exposed, He doesn’t ethics.  রেনেসাঁসের পর তাঁর মত সূক্ষ্মতা আর কোনও দার্শনিকের ছিল না। ‘এটা একটা অস্বস্তিকর আয়না এটা সরে গেলে ভালো হয়।’ মানুষের অভ্যেস, ঝোঁক, বিভিন্নতা, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। কিন্তু তাঁর মধ্যেও তিনি খুঁজছেন। ওর কথা এতো সত্যি যে আমরা প্রথমে ভেঙে পরি। পরে বুঝতে পারি এবং হাসি। তিনি বিশ্বাস চেয়েছিলেন। সত্যানুরাগ ছিল তাঁর। Who was a Nobel man.

ফরাসি নবজাগরণের পরের ব্যক্তি ছিলেন, লা রোশফুকো।

La Rochefoucauld (1613-1680)-  চিন্ময়বাবু আমাদের ফরাসি নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত সমাজের আলোয় রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে এলেন বাংলার রেনেসাঁয়। তাঁর কথায়, বাংলায় রেনেসাঁ উনবিংশ শতাব্দীতে। আমরা বার বার জানতে চেয়েছি ফ্রান্সের কাছে। পাশ্চাত্যের কাছে। আমাদের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রামমোহন, ডিরোজিও, আমাদের রেনেসাঁর নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফরাসী দার্শনিক লা রোশফুকো বলছেন, ‘আবেগ যেমন বুদ্ধিমানদের পাগল করে দিতে পারে তেমনি পাগলদের বুদ্ধিমান করে দিতে পারে।’, ‘আন্তরিকতা মানে হ্রদয়ের উন্মেষ, কিন্তু যা দেখা যায় তা অভিনয় ছাড়া কিছু নয়।’ অধ্যাপক গুহ আরও উল্লেখ করছেন, ‘এমন মেয়েকে খুঁজে পাওয়া শক্ত নয় যার অনেক প্রেমিক আছে। কিন্তু এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া শক্ত যার মাত্র একজন প্রেমিক।’, ‘বোকা লোকেদের সাহচর্য ছাড়া বুদ্ধিমান লোকেরা অসহায় বোধ করে।’, সপ্তদশ শতকের ফরাসি নবজাগরণের যুগনায়কদের কথা যত শুনলাম আমাদের মতো অর্ধশিক্ষিত দেহাতি মানুষ বুঝলাম সভ্যতা আমাদের কোন ভাষা চিনতে বলে। নাগরিক সাংবাদিকদের ভিড়ে আজও নিজেকে খুঁজছি। বিগত শতাব্দীর সত্তর দশক থেকে পথ চলতে চলতে নাগরিক সাহিত্যের লেখকদের আলটপকা সংস্কৃতিতে হাবুডুবু খেয়েছি।

এবং লাল, নীল, সবুজ, কালো প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে দেখছি আর ভাবছি ওরা কোন আকাশে থাকে! ওদের বাতাসের নাম কি? গন্ধ কি? ভালোবাসা সব কি আজ ‘রাত চরা পাখি? সবাই বলছে ‘আমি সত্য’ আমাকে ধরো। আমার সঙ্গে এসো আমি হ্যা ‘আমি’ পারব পথ দেখাতে। ওদের ওই অচেনা দেহ, অচেনা চেতনা, অচেনা মন চেনা জিগীষা, জৌলুসে আমাদের হড়হড় করে টেনে নিয়ে যেতে চায়। নাগরিক সভ্যতায় সবাচ্ছন্দ্য হারিয়ে, সারল্য ভেঙে পৃথিবীর ব্যবচ্ছেদ দেখি। হায়রে এটা কি বাস্তব? না পরাবাস্তব? দেহের মোটা চামড়া পাতলা হয়ে আসে। গাল, চিকে কুচকানো চামড়ার ক্লান্তিকর বসন্ত। সাদা ফিন ফিনে ফাইন সুতোর ধুতি, মসৃণ সুতোর গিলে করা পাঞ্জাবির সূক্ষতায় ‘বাবু সভ্যতা’ আমাদের ‘ভুল-ভুলাইয়া’-র গোলকধাঁধায় ঘুরিয়ে নিয়ে চলে। ওদের মুখে এক মন ভোলানো হাসি। মানুষ বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হয়। আবার বিশ্বাস করে। কারন বোতলের রঙ সময়ে সময়ে বদলে যায়। সভ্যতা কিন্তু থেমে থাকে না। সৃষ্টি নিজের ছন্দে, আপন নেশায় পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদ রচনা করে যায়। সাদা প্রজাপতি আরও সাদ হয়ে সাদা কবুতরের দেশে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায়।

ক্ষমতার অলিন্দ থেকে যারা আজও আমাদের শাসন করছে, দুর্বল মানুষকে নিয়ে হাসি, ঠাট্টা তামাশা করছে, ব্যাঙ্গ করছে তাঁরা যে দেশের মানুষই হোক তাঁরা নিজেদের চালাক ভাবে এবং তাঁরা সংগঠিত। একই সভ্যতা এবং ওই সভ্যতার, সমাজের জীব। চিন্ময় গুহ আরও শোনালেন, ‘কারও চরিত্রে রহস্য কিছু খুঁজে না পেলে বুঝতে হবে ভালো করে খোজা হয়নি।’, ‘আমরা জানি স্ত্রীর কথা কম বলতে হয়। কিন্তু আমরা এটা জানি না যে আমাদের নিজেদের কথা আরও কম বলা উচিত।’, সেদিন শেষের দু’টো ছিল সেরা কোটেশন। একটা ‘প্রতিবেশীর সর্বনাশ শত্রু মিত্র সকলকেই খুশি করে।’ আর দ্বিতীয়টা ছিল ‘বইয়ের চেয়ে মানুষকে পড়া অনেক বেশী জরুরী।’

পাশ্চাত্যের শপ্তদশ দশকের যুগান্তকারি আলোর পদচারণার উব্দেলিত একান্ত শব্দালোক এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা সহ বিভিন্ন মহাদেশ শুনতে পেয়েছিল। ইতিহাসের ব্যক্তি এবং ব্যক্তিত্ব আমাদের পথ চিনতে সাহায্য করে। ফরাসি বিপ্লবের ক্ষত আজকের বর্তমানেও সভ্যতার পদশব্দ শুনতে বলে। সেই কারনেই ফরাসিবিদ চিন্ময় গুহ আমাদের অবিভক্ত বাংলার রেনেসাঁর উল্লেখ করেছেন। বাংলার রেনেসাঁস নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। রেনেসাঁস নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। প্রশ্ন ওঠাটাই খুব স্বাভাবিক। আজও নানা ঘরানার বিশ্লেষণ করছেন বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী ভারতীয় চিন্তাবিদদের দল। বাংলাদেশেও পৃথকভাবে গবেষণার কাজ হচ্ছে। ইউরোপের নবজাগরণের সঙ্গে বাংলার নবজাগরণকে কি সত্যিই তুলনা করা যায়? বিভিন্ন আলোচক প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে সামনে রেখে। জাতীয়তাবাদ, কৃষিজীবী মানুষের আশা আকাঙ্খা, সাপ্রদায়িক বিষয়ক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে সেইসব ভারতীয় প্রাতঃস্মরণীয় মনীষিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচকরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের সদিচ্ছা নিয়ে কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যবিত্তের মননে, কর্মধারায়, চিন্তায় রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, ডিরোজিও মধুসূদন প্রত্যেকেই পৃথক পৃথক আসন লাভ করেছিলেন। একবিংশ শতাব্দীতে আজও তাঁদের সেই আসন পাকাপোক্তভাবেই আছে। বাংলার নবজাগরণের দু’টি স্বতন্ত্র ধারার কথা ঐতিহাসিকরা বলে থাকেন। একটা ছিল ধর্মকে সামনে রেখে সমাজ সংস্কার। দ্বিতীয় ধারাটি ছিল ধর্মকে প্রশ্নের বাইরে রেখে সমাজ সংস্কার। বাংলার রেনেসাঁর ধারাবাহিকতায় বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে যে আন্দোলন বাংলায় তথা ভারতে হয়েছিল তার প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশে পড়েছিল।

বঙ্কিমযুগ শেষে রবীন্দ্র যুগের শুরুতে সেই প্রভাব থেকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ নিজেও মুক্ত ছিলেন না। চিত্তরঞ্জন দাশ লিখছেন, ‘’বাঙ্গালী হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, খ্রীস্টান হউক, বাঙ্গালী বাঙ্গালী। একটি বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে। একটা স্বতন্ত্র ধর্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে। অধিকার আছে, সাধনা আছে, কর্তব্য আছে। বাঙ্গালীকে প্রকৃত বাঙ্গালী হইতে হইবে।‘’ (দেশবন্ধু রচনা সমগ্র, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা- ৭৪/৭৫, প্রকাশক- তুলি কলম)

দেশবন্ধু ওই প্রবন্ধে আরও লিখছেন, ‘’………… সমস্ত মানব জাতির মধ্যে সত্য ভ্রাতৃভাব জাগাইতে হইলে ভিন্ন ভিন্ন জাতি সমূহকে বিকশিত করিতে হইবে। তাহার পূর্বে এই ভ্রাতৃভাব অসার কল্পনা মাত্র। জাতি তুলিয়া দিলে   বিশ্বমানব দাঁড়াইবে কোথায়? যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির বিকাশ না হইলে একটি পরিবারের উন্নতি হয় না, যেমন পরিবার সমূহের উন্নতি না হইলে সমাজের উন্নতি হয় না, যেমন সমাজের উন্নতি না হইলে জাতির উন্নতি হয় না, ঠিক তেমনি সেই একই কারণে সকল ভিন্ন ভিন্ন বিশিষ্ট জাতির উন্নতি না হইলে সমগ্র মানবজাতির উন্নতি হয় না। বাঙ্গালির শিরায় শিরায় যে রক্তই প্রবাহিত হউক না কেন, সে রক্ত আর্যই হউক কি অনার্যই হউক, কি আর্য-অনার্যের মিশ্রিত রক্তই হউক, যাহা সত্য, তাহা সত্যকামের মত স্বীকার করিতে বাঙ্গালী কখনও কুণ্ঠিত হইবে না।‘’

চিত্তরঞ্জন বাঙ্গালী জাতি প্রসঙ্গে ওই রচনায় আরও লিখছেন, ‘’………জাতিত্ব মরেনা— শুধু সকল জাতির মধ্যে সকল বিশিষ্ট রুপের মধ্যে যে একত্ব আছে, তাহাই জাগিয়া উঠে, এই জন্যই ইংরাজ এ দেশে আসিয়াছিল। এই খানেই প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের যথার্থ মিলন। এই ক্ষেত্রেই universal brotherhood of man সম্ভব। তাই শুধু এই দিক দিয়া দেখিলেই দেখা যায়, the East and the West have met- not in vain. অর্থাৎ প্রাচ্য ও প্রতীচ্য যে একত্র হইয়াছে। তাহা ব্যর্থ হইবে না’’। (দেশবন্ধু রচনা সমগ্র, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা- ৭৪/৭৫ প্রকাশক- তুলি কলম)

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা ইউরোপের সপ্তদশ শতাব্দীর নতুন আলোর খোলা বাতায়নের দিকে বারে বারে চেয়েছি। আমেরিকার সুচারু ধ্রুপদী সংস্কৃতির নবান্নের আশ্রমে ‘শান্তিনিকেতন’ খুঁজে পেয়েছি। ফরাসি দার্শনিক রম্যাঁ রলাঁ এবং রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের কথা আমরা জানি। ভারত তথা আমাদের বাংলা ঘরেবাইরে-র মেধা, শিল্পের সূক্ষতা, ধ্রুপদী সাহিত্য, সঙ্গীতকে আপন করে চিলেকোঠায় যত্ন করে রেখে দিয়েছে। ফিউসন-এর যৌথ ঘরানা সম্ভবত সেই সূক্ষাতি সূক্ষ অনুভূতি থেকেই সৃষ্টি হয়। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর ১৭৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত ফ্রান্সের লা রশেল-এ বিশ্ববিখ্যাত ‘আকাদেমি দে বেল লেৎতর, সিয়াঁস এ আর’ এ বছর সম্মান জানাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ফরাসিবিদ চিন্ময় গুহকে। উল্লেখ করা থাক, ফরাসি থেকে ইংরেজি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় অনূদিত সাহিত্যের  জন্য এ বছর ফরাসি দূতাবাস প্রবর্তিত প্রথম রমাঁ রলাঁ স্মারক পুরষ্কারের অন্যতম বিচারক চিন্ময় গুহ। এই পুরষ্কার ঘোষিত হবে ২৮ জানুয়ারি জয়পুর সাহিত্য উৎসবে।

কলকাতায় ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠানে আলিয়াঁ ফ্রাঁসেজ সভাঘরে যে বক্তব্য অধ্যাপক চিন্ময় গুহ রেখেছিলেন, সেই বিনি সুতোর মালার শেষ পত্রটি ছিল এই রকম, তিনি বলছেন, ‘’আমরা বড় মানুষদের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলাম। পারলাম কি না জানি না। কিন্তু আমরা সেই মানুষের কাছে পৌঁছতে পারলাম যারা মানুষকে ভালোবাসে। মানুষের কাঁধে হাত দিয়ে বলে আমি পাশে আছি। আমার মনে হল আমরা আয়নার সামনে দাড়ালাম।‘’

Leave a comment

Filed under Uncategorized

হেমন্তের গাজন

শুকনো পাতার আগুন জ্বেলেও হৃদয় পোড়েনি—-

অকাল বোধ্নের মত শীত এসে পাতা ঝ্রা বসন্তের

সরোদের না বোঝা শব্দের সুপ্রভাত বলেনি।

গোবর লেপা মাটির দেওয়াল, ধান বিছানো

গোবর লেপা উঠোন,

কতদিন কতকাল আগে দেখেছি।

শিশির ভেজা হেমন্তের গাজন ভৈরবী সাদা হাসের পীঠে চড়ে

সোনালী রোদ, মাঠ ক্ষেত কতযুগ আগে………

নীল স্বপ্নের আস্তরণ চাপিয়ে

সোনালী ধানের শীষ খুঁজে ফিরেছি।

ও শালিক, ও বক, ও কাক তোমরা আজও আছ,

আসা যাওয়ার পথে পথে বক বক বক্ম, বক বক বক্ম,

পায়্রা, চড়ুই থাকে না, পোড়া হ্রদয়ের

গোপন চিলে কোঠার ছাদে। সভ্যতা, আধুনিক সভ্যতালেপা

নাগরিক ছন্দে ‘লিরিক’ পথ খোঁজে নীলকণ্ঠ পাখির ডানায়।

শুকনো ধানের মেঠো পথে হেঁটে আজও হৃদয় পোড়েনি।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

মানবতার পক্ষে আছি অধর্মে নেই জিরাফেও নেই

মানবতার পক্ষে আছি অধর্মে নেই জিরাফেও নেই:

প্রকৃতি তোমার চিরনন্দিত অপরূপ শোভা তুমি কেন লুকিয়ে রাখতে পার না? অতি সাধারণ জীবনের যেটুকু অভিঞ্জতা হয়েছে, যৌবনের বিহান বেলায় প্রথম চোখের ভাষায় বিহার, ঝাড়খন্ড, অসম, ওড়িশা, মেঘালয় এই কয়েকটি পাহাড়তলীর রাজ্য একসময় দেখেছি। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, লঝমন ঝোলা, হরিদ্বার দেখেছি। আহা কি সে অপরূপ সৌন্দর্য। অকৃপণ সবুজের মায়াময়তায়, মেঘতলির সদাহাস্য কুঠুরি খুলে বসে আছে অচেনা এক নিষ্পাপ কুমারী নারী। অতি সন্তর্পণে ছুঁয়ে বলে আমি তোমার সেই মেয়ে। এসো আমাকে আলিঙ্গন করো। পাশে ঝোরা আছে। নদী আছে, গঙ্গা আছে। ছুঁয়ে যাও আমাকে, সব কলঙ্ক পাপ ধুয়ে যাবে। আমি আজ তোমার প্রেমিকা হব। ভালোবাসার পাহারি জংলা রঙের ভেলা নিয়ে বসে আছি। কত রঙের প্রজাপতি উড়ছে দ্যাখ আকাশে বাতাসে। রঙিন প্রজাপতি গাছের পাতায় পাতায় ঘুরছে নব যৌবনের বাতায়ন খুলে। গাছের ডাল, পাতা, ফুলের রেণু নিঙরে প্রাগে পরাগে সম্মেলনের কবিতার চরণ লেখে। পয়ার ছন্দে। প্রেম এসে ফিরে যায় একাকি গহন বনে। এসো তুমি জলে জঙ্গলে। বলো, হে বন্য নারী আজ আমি তোমার প্রেমে তৃপ্ত। পাত্র উজাড় করে ভরিয়ে দাও আমায়। আহ্বান করে অচেনা বন্য সুন্দরী তনয়া যেন বলছে, তুমি পুরুষ, তোমার ক্লান্ত শ্রান্ত ঘর্মাক্ত শরীর দেখলে আমার নারীত্ব আমাকে আরও শান্ত করে রাখে। আমার ঘৌমটা খুলে অদেখা সুন্দরকে উজ্জ্বল করো। প্রজ্বলিত করো। অদেখা অচেনা সুন্দরের কাছে আজ তোমাকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। আমি তোমার সেই বন্য নারী।

সপ্ততরীর ঢেউ ভাঙা অকৃত্রিম মেঘমল্লারের নৃত্যে ‘তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ’ ছন্দে রাজপ্রাসাদের রাজকীয়তা নিয়ে ডেকে পাঠাও সকলকে। সবুজ বৃক্ষরাশি কখনও বৈশাখী ঝঞ্ঝায়, কাল বৈশাখীর উথাল পাথাল আন্দোলনে প্রলয়ের বড় গল্প শোনায়। অবিরাম বৃষ্টি শেষে ‘টুপ টুপ, টুপ টুপ’ পাহাড়ি ঝোরার চেনা অচেনা খিল খিল হাসি। কে একজন প্রশ্ন করে ‘এ বাবু হেথাকে কখন এলি?’ শরতের এলোমেলো মেঘ সাদা সাদা বকেদের ডানায় ডানায় আবার সে ফিরে ফিরে আসে, ছোট নাগপুরের আদিবাসী গ্রামের ‘আরণ্যক’ উপাখ্যানের বহু বর্ণনায়। হে আমার অচেনা প্রকৃতি তোমার প্রলয় রুদ্র মুরতি সৃষ্টির বন্ধন ভেঙ্গে আগুনে পোড়া মানবতা ছুঁয়ে যায়।

যে আকাশে বাদলের গান শুনি সেই আকাশে সাদা কালো, লাল নীল, হাজারো রঙের পাখ পাখালির কলরব। চেনা অচেনা আকাশেও দবন্দ থাকে, অসীম আদিগন্ত কালো মেঘেদের অন্তরালে অবিরাম আকাশ দখলের সচেষ্ট অভিলাষ থাকে। ওরা পক্ষীরাজের দেশের ভাষায় কথা বলে। এতবড় আকাশ, প্রকৃতি সেও তোমার স্বপ্ন দেখানো ঘুম ভাঙা ভোরের দিগন্ত বলয়। এই বলয়ে পাখিদের দবান্দিক অবলোকন আহ্বান করে দেশ বিদেশের পরিযায়ী পাখিদের। সাগরের চরাচরে, নদীর বালুকা বেলায়, হ্রদের শীতল উষ্ণতায় পরিযায়ী পাখি অক্লান্ত যাত্রা পথে অধর্মকে শাসন করে মানবতার চড়ুইভাতির আনন্দে। পটুয়া শিল্পীর গ্রাম্যপটে ছবি হয়ে উড়ে বেড়ায় তাঁরা। বলে আমরা আকাশেও আছি, মাটিতেও আছি, তোমার আঙিনায় থাকব। এই জগৎসভায় পরিক্রমা করতে করতে বারে বারে বলি জিরাফের পীঠে বসতে চাইনা। হাঁটব জিরাফের পথরেখায়। গ্রাম্য পটুয়ার আঁকা আলভাঙা সড়কের পল্লবিত পক্ষীবালিকার নূপুরের তালে তালে। বলব অধর্মে নেই মানবতায় আছি।

সেদিন অনেকদিন পর এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বইপাড়ায় গিয়েছিলাম। পরিযায়ী পাখিদের মত ঘুরতে ঘুরতে যাযাবর জীবনটা চিনতে কলকাতার প্রাচীন বৃক্ষরাশির ছায়াতলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অতীতের কথকতা, স্মৃতি, ভাঙা ভাঙা ছন্দে হাঁটি হাঁটি এসে আলিঙ্গন করছে। আমি উদাস চাউনিতে হেরিতেছি ক্লান্ত, পথভ্রস্ট আহত কবুতরের মতো। কলেজস্কয়ারের পূর্বদিকের গেটের সামনে তখন কিছু লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে কিছু একটা দেখছে। ভিড় দেখলেই যেমন আম বাঙালি ভিরে যায়। দেহাতী বাঙালিদের মতো আমিও গলা ঢুকিয়ে দিলাম। ভিড়ের গলতা দিয়ে দেখলাম আমাদের সমবয়সি একজন লোক হাতে একটা আড়াই ফুট লম্বা পুতুল নিয়ে কি সব দেখাচ্ছে। পুতুলটা পুরনো নতুন কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো সেলাই করে তৈরি করা হয়েছে। পুতুলের পোশাকে বোঝা গেল পুতুলটি পুরুষ চরিত্র। জিনসের প্যান্ট। দুটো পকেট দেওয়া জলপাই রঙের জামা। জামার একটা পকেটে ভারতের ‘জাতীয় পতাকা’-এর স্টীকার আলাদভাবে সেলাই করা আছে। কোমরে চওড়া চকলেট রঙের বেল্ট। পুতুলের মুখটায় সার্কাসের ‘জোকার’-এর মতো করে রাঙানো। যে লোকটা পুতুলটা ধরে আছে তাঁর বাবরি চুল। পেল্লাই বড় এক দাড়ি। পোশাক পড়ে আছে সেও এক বিচিত্র। গায়ে পুরনো দিনের বাঙলা সার্ট। গায়ক হেমন্তবাবুরা যেমন সার্ট ব্যবহার করতেন। ঢোলা পায়জামা। পায়ে কাঠের খড়ম। লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা লাঠিতে বাঁধা একটা প্ল্যাকার্ড ধরে আছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মানবতায় আছি, অধর্মে নেই জিরাফেও নেই’। নীচে ছোট করে লেখা ‘তিরপিতা’। বুঝলাম ‘তিরপিতা’ মানে গোষ্ঠীর নাম।

লোকটা বলছে, ‘এই দ্যাখেন দাদা, দিদিরা এই পুতুলটো এখনও অর দ্যাশের ভাষায় দশের ভাষায় কথা বুলে। ইটো পুতুল নাচের ইতিকথা লয়। আমি মানিকবাবুর ভাষায় কথা বলতে পারিয়ে না। আমার পুতুল কি বুলছে আপনারা শুনেন।’

লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমাহার বাড়ি কুথায়?’

‘ওই তিরপিতা গাঁয়ে। কাঠ ব্যবসায়ী হর্ষবাবুদের পাড়ায়।’ পুতুল উত্তর দিল।

লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমহার লিখা পড়া কতদূর?’

‘আঞ্জে বিপিএল কার্ড নাইখো। পঞ্চায়েতে বাবুরা বুললে বিপিএল কার্ড না থাকলে স্কুলে পড়া চলবে না। আমি বুললাম আমার বাপের বিদ্যাসাগর ছিল না আমাহার ‘বিপিএল কার্ড’ লায় বাবু। আর স্কুলে লিলে না।’

‘আচ্ছা গোবরা তুমি এখন কি কাজ কর?’

‘কাজ কুন্ঠি পাব? আমি বামুন-কায়েত, সদগোপ চাষির ছেলা যে আমাকে কাজ দিবে? আবার দ্যখেন আহমি সিডিউল কাস্ট লই। দলিতও লই। বাপের পদবী ছিল ‘মাল’। তবে আমার বাপ একদম মাল চিনতে শিখেনি। ওই লেগি আমার এই হাল হুলো কাকা। একশো দিনের মাটি কাটার কাজেও কেউ লিছে না। আমাকে কাজ দিলে আমি নাকি ‘পুকুর চুরি’-এর কথা সবাইকে রসিয়ে রসিয়ে বুলি দিব?’ এই কথা কি ঠিক? আপনি বুলেনতো কাকা? আমি কি পঞ্জজনের ঢুলি? ধান্দা আমিও বুঝি। মাগ্যিগণ্ডার দ্যাশে পাঁচ দশ টাকা কমিশন সব্বাই খেছে।

‘আমাকে আজ কাকা বলছ ক্যানে? ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি কাজ না করলে সারাদিনের খাওয়া খরচ, বাড়ি ঘর মেরামতির টাকা, চিকিৎসার খরচ এইসব কুথা থেকি পেছ?’

‘ এই যে আপনার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছি। পাঁচটো কথা বুলছি। সাপের পাঁচ পা দেখার কথা লয়। ওই আপনার মতো বাবুদের কথা। সেই কথা শুনি গাঁ গঞ্জের দাদা দিদিরা আনন্দ পেছে। তারপর অরা যা দিছে তার ভাগ আমাকে কিছু দিছেন আপনি মামা। তবে কিনা ফাউল করছেন আপুনি।’

‘তুমি গোবরা একবার ‘কাকা’ বুলছ, একবার ‘মামা’ বুলছ ক্যানে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আর ফাউল কি করলাম?’

‘আপনি বুলাছিলেন আপনার একশো টাকা আয় হলে তিরিশ টাকা আমাকে দিবেন। একশো তিরিশ টাকা আয় হলেও তিরিশ টাকা আহমাকে দিবেন। আপনি কি করছেন? আমাকে তিরিশ টাকা দিছেন আপনি? ১২ টাকা দিছেন। তবে ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে ১২ টাকা পেছি। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট করি দিয়াছেন। আর ১৮ টাকা ভাউচার লিখে ছিঁড়ে দিছেন, ভাউচার ছিঁড়ে দিছেন। ১৮ টাকা আপনি পকেটে পুরছেন। ইটো ফাউল লয় জামাইবাবু? পিএফ দিছেন না, ইএসাই করি দেননি। তবু আহমার এক চোখ লিং আপনার সাথে কাজ করছি। এই গুলান ফাউল লয় জামাইবাবু?’

‘সে না বুঝলাম, তা এতসব মেনে লিং আমার সঙ্গে কাজ করছ ক্যানে শালো?’

‘এইবার ঠিক বুল্লেন, কলকাতার যে খানে যেছি সবখানে আপনাদের লোক। আমার বা দিকে দ্যাখেন যে লোকগুলান বসি আছে ওইখানে আপনার মতো জামাইবাবু অনেক পাবেন। আবার ডান দিকে দ্যাখেন ওইখানে মামা,কাকাদের দল পাবেন জামাইবাবু।’

এতক্ষণ যে সব কোতুহলী মানুষ ‘পুতুলের কথা’ শুনছিল তাঁরা অনেকেই বিছিয়ে দেওয়া চাদরে পাঁচ টাকা, দশ টাকার নোট, একটাকা দুটাকা, পাঁচ টাকার কয়েন ফেলছিল। এদের মধ্যে থেকে একজন বলে ফেলল ‘এই যে পুতুলের মালিক তুমিও বাংলার বাইরের ব্যবসা শিখে গেছ বস?’

ভিড় পাতলা হতে থাকে। মালিক ধমক দিয়ে পুতুলকে বলে, ‘কি সব বুলছ তুমি আজ গোবর? এবার কি করবে? ভিড় যে পাতলা হুং গেল?’

‘আঞ্জে কি আর করব? হর্ষবাবু বুলাছিল কলকাতার সব রাস্তা থিকা চেতলা যাওয়ার ৩৩ নম্বর দোতলা বাস পাওয়া যায়। আমি ইবার ওই বাস ধরি ‘নবান্ন’ দেখতি যাব। পুলিশবাবুরা ভিতরে ঢুকতে দিলে পঞ্চুকাকুকে বুলব আহমাকে তিনটা কার্ড দেন। একটো ‘সিডিউল কাস্ট’ কার্ড, একটো কাজ পাওয়ার জব কার্ড আর একটো ‘হেলথ কার্ড’। আমার চোখে ‘ন্যাবা’ হলছে।’

পুতুলের মালিক এরপর আর কথা না বাড়িয়ে গোবরকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তখনও দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের উদ্দেশ্যে বলল, ‘গোবরের শরীরটা ভালো নেই। আজ ওকে একটু বিশ্রাম দিন। আবার একদিন আমরা ওর কথা শুনব।’

Leave a comment

Filed under Uncategorized

সংগঠিত শ্রেণীর সুচতুর শোষণ এবং শাসন ওরা চিনলেও কাজ করতে বাধ্য হয়

কিন্তু কেন হয়? আমার নিজের দেখা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাইছি। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ আমি। এ কথা একাধিকবার একাধিক জায়গায় লিখেছি তাই বিস্তারিত লিখছি না। সময়টা গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষেরদিকের হবে। বাড়িতে কিছু টাকার প্রয়োজন ছিল। বাবা তখন মারা গেছেন। পারিবারিক পেনসন মাত্র ৫০ টাকা। মা পেতেন। সেইসময় আমার মায়ের একটা চোখে দীর্ঘদিন ছানি পড়ে ছিল। আমাদের জেলার একজন বামপন্থী নেতার মা আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন দেশ উদ্ধার পরে করবি। আগে মায়ের চোখ অপারেশনের ব্যবস্থা কর। আমি সেই কথামতো দু’মাসের জন্য একটা ইটের ভাঁটায় ম্যানেজারের চাকরি করি।

৩০০ টাকা মাসিক বেতনে দু’মাস কাজ করি। ওই সময়টায় খুব কাছ থেকে ইট ভাঁটার মালিকের শোষণ এবং শাসন দেখেছি। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপর এই শোষণ চলত। অবিভক্ত বিহার থেকে আসা দেহাতি মানুষ এবং আদিবাসী পরিবারকে ইট ভাঁটায় থেকে কাজ করতে দেখেছি। এক একটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, কম বয়সী ছেলে মেয়ে প্রায় গোটা পরিবার ইট ভাঁটায় কাজ করার সুবাদে শোষণের স্বীকার হতে বাধ্য ছিল। স্থানীয় গ্রামের পুরুষরা ইট ভাঁটায় কাজ করলেও মহিলারা গৃহ পরিচারিকার কাজ বেছে নিত। ইট ভাঁটা নিয়ে সমীক্ষা এবং গবেষণার  কাজ যারা করেছেন এবং করছেন তাঁরা এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত বলতে পারবেন। সাহিত্যিক এবং সমাজকর্মী মহাশ্বেতাদেবী সম্পাদিত ‘বর্তিকা’ পত্রিকা এই বিষয়ে কিছু কাজ করেছিল বলে জানি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এই বাংলা তথা ভারতবর্ষে ‘গৃহপরিচারিকা’ নামক পদটি আজও বিলোপ হয়নি। দেশ দাবি করছে গ্রাম ভারতের সমাজ ব্যবস্থা ভাঙতে শুরু করেছে। ইন্ডিয়া নামক দেশটি উত্তর আধুনিক সভ্যতায় উত্তীর্ণ হয়েছে। বিশ্বায়ন, উদার অর্থনীতি, মল, আইনক্স, মোবাইল ফোন, স্ম্রাট ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দেশকে আধুনিক সভ্যতা চেনাচ্ছে? কিন্তু ইউরোপ আমেরিকার বার বার উচ্চারিত সেই শ্লোগান? ‘নিজের কাজ নিজে করুন’। অর্থাৎ ‘সেল্ফ সারভিস’-এর সংস্কৃতিতে উত্তর আধুনিক ভারতবর্ষের কি উত্তরণ আদৌ হয়েছে?

২০০৭ সালের এনএসএসও রিপোর্ট বলছে ভারতে কৃষিক্ষেত্রে কাজ করেন কর্মরত মহিলাদের ৭৩ শতাংশ। অকৃষি ক্ষেত্রে কাজ করেন এমন মহিলাদের সংখ্যা ২৭ শতাংশ। এই ২৭ শতাংশের মধ্যেই আছে ভারতের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং সাধারণ সরকারি চাকুরে বাবুদের বাড়ির গৃহ পরিচারিকার দল। কলকাতা শহর এবং শহর সংলগ্ন শহরতলীতে যারা থাকেন তাঁরা জানেন দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার লক্ষ্মীকান্তপুর, ক্যানিং সহ সুন্দরবনের একাধিক অঞ্চল থেকে গৃহ পরিচারিকার দল আসে। ওইসব অঞ্চলের গৃহ পরিচারিকার দল সূর্য উঠার আগে কাকভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। ভোরের ট্রেনে তাঁরা বারুইপুর, সোনারপুর, গড়িয়া, বাঘাযতীন, যাদবপুর, বালিগঞ্জ এবং শিয়ালদহ শহরে নেমে ছড়িয়ে পড়ে শহর এবং শহরতলীর বাবুদের বাড়িতে। এদের আমরা দু’ভাবে চিনি।

একদল সকালে বাড়ি থেকে এসে তিনটে চারটে বাড়িতে কাজ করে আবার নিজের বাড়িতে ফিরে যায়। উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙ্গা সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও কিছু মহিলা পরিচারিকার কাজ করতে আসে। অন্য দলটি তাঁরা বাক্স পেটরা নিয়ে ‘বাবু বাড়িতে’ চুক্তি অনুযায়ী হাজির হয়। ২৪ ঘণ্টার অঘোষিত ‘বন্ডেড লেবার’। ছ’মাস অন্তর বা বছরে একবার ছুটি পায় এই দ্বিতীয় শ্রেণীর দল। এঁদের দলে যারা থাকেন তাঁরা সংগঠিত শ্রেণীর সুচতুর শোষণ এবং শাসন মেনে নিতে বাধ্য। আমাদের বাংলার থেকেও দেশের অন্যান্য রাজ্যের ছবি আরও ভয়াবহ। আমাদের দেশে গৃহ পরিচারিকার সংখ্যা ৪০ লক্ষ। এঁদের মধ্যে ২০ শতাংশের বয়স ১৪ বছরের কম। যাঁদের শিশু শ্রমিক বলা হয়। ওইসব শিশু শ্রমিকদের নিয়ে ভারতে কাজ করছেন শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মানবাধিকার কর্মী কৈলাস সত্যর্থী।

যে সব পরিচারিকার দল বাবুর বাড়িতে কাজ করে সেই অর্থে এইসব পরিচারিকার নিজস্ব কোনও ঘর থাকে না। নিজেদের জন্য তাঁরা একান্ত কোনও সময় পায়না। শ্রম আইনের সমস্ত সুযোগ থেকে এরা বঞ্চিত হন। এইসব গৃহ পরিচারাকারা যে হেতু শ্রমিকের স্বীকৃতি পাননি তাই এঁদের শোষণ করাটাও সহজ। কাজের সুরক্ষা নেই, ন্যুনতম মজুরি পাওয়া যায় না। সাপ্তাহিক ছুটির সুযোগও নেই। বার্ধক্য ভাতা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। ভবিষ্যনিধি প্রকল্পের সুযোগ থেকেও এঁরা বঞ্চিত হয়ে থাকেন। অনান্য সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে বাধ্য হয় এঁরা। ভ্রাম্যমাণ গৃহপরিচারিকারাও উল্লেখিত সুযোগুলি থেকে বঞ্চিত। গৃহশ্রমিকদের কথা ভেবে ভারতে দু’বার একটি বিল আসে। প্রথমবার ১৯৯০ সালে এবং দবিতীয়বার ১৯৯৬ সালে। সেই বিল সম্ভবত আজও আটকে আছে। ভারতে এইসব পরিচারিকাদের কাজ নিয়ে মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটক রাজ্যে পৃথক পৃথক আন্দোলন হয়েছে। আন্দোলনের ফলে রাজ্য সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ওইসব রাজ্যে রাজ্য সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তে বৃহৎ একটি কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা কতটা উপকৃত হয়েছেন? মানুষের স্বীকৃতি, কাজের স্বীকৃতি এবং মর্যাদার দাবিতে এই শ্রেণীর মানুষেরা কোথাও কোথাও ইউনিয়ন গড়ে তুলেছেন। যদিও আমাদের রাজ্যের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় বলা চলে। এখানে গৃহ পরিচারিকাদের অবস্থা বাম জামানাতে যেমনটি ছিল তার থেকে একটুও বদলায়নি। কোনও নতুনত্ব নেই। আমাদের রাজ্যে গৃহপরিচারিকার দল বহু ক্ষেত্রেই বিভ্রান্ত। অশিক্ষা, সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ, সারল্য এঁদের বেঁধে রাখে অকথিত এক বন্ধনের মধ্যে। অদৃশ্য এক সংস্কৃতিতে এঁদের টেনে নিয়ে যেতে চায়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের  স্থানীয় মাতব্বর নেতাদের পরামর্শ শোনা এবং মানতে গিয়ে আসল লড়াইটা ভুলে বসে হত দরিদ্র পরিবার থেকে আসা ওইসব গৃহপরিচায়িকারা। প্রকৃত শ্রমের মূল্যের কথা ভুলে মাসিমা, বৌদি, কাকিমা, পিসিমাদের কাছ থেকে বাজার চালু কিছু মূল্যবোধ নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এবং স্থানীয় নেতাদের প্ররোচনায় সেই মূল্যবোধ নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। হারিয়ে যায় জীবনের জন্য লড়াইয়ের আসল লক্ষ।

সম্প্রতি গৃহপরিচারিকাদের নিয়ে তৈরি দু’টি তথ্যচিত্র দেখার সুযোগ হয়েছে। সংগঠক সংস্থা ‘পিপলস ফিল্ম কালেক্টিভ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘দেয়ার হোমস, হার ওয়ার্কপ্লেস’, ডমেস্টিক ওয়ার্ক অ্যান্ড ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইন ইন্ডিয়া। ১১ ই নভেম্বর কলকাতার মুক্তাঙ্গন রঙ্গলী (রাসবিহারী) মঞ্চে ছবি দু’টি দেখার সুযোগ হয়। প্রথম ছবিটির নাম ছিল ‘হামারা ঘর’ পরিচালক কিশলয় গঞ্জালভেজ। দ্বিতীয় ছবিটির বিষয় ছিল গৃহপরিচারিকা এবং নারি পাচার। পঙ্কজ জোহর পরিচালিত ছবিটির নাম ‘সিসিলিয়া’। দ্বিতীয় ছবিতে আমরা সমাজকর্মী তথা নোবেলজয়ী মানবাধিকার কর্মী কৈলাস সত্যার্থীর উপস্থিতি দেখতে পাই। দু’টি ছবি অত্যন্ত পরিশীলিত এবং দরদী মনন নিয়ে তৈরি করেছেন পরিচালকদ্বয়। ছবি দু’টি প্রসঙ্গে উদ্যোক্তাদের বক্তব্য তুলে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

‘উহাদের বাড়ি যখন তাঁহার কর্মক্ষেত্র।

আমরা দেখব দু’টি ছবি। কিশলয় পরিচালিত ‘হমারে ঘর’ ছবিটি চাবুকের মত আছড়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে মধ্যবিত্ত মননে। মধ্যবিত্ত যেখানে কর্মদাতা হিসেবে মালিক-শ্রমিক সম্পর্কে লিপ্ত গৃহশ্রমিকের সাথে, যেখানে এই শ্রমসম্পর্কের বিভিন্ন অদৃশ্য পরত, শ্রেণীর প্রশ্ন কীভাবে কাজ করে অনেক গভীরে, এমনকি আপাত প্রগতিশীল বাড়ির আপাত ‘ভালো ব্যবহারের’ অনেক গভীরে ঢুকে সমস্ত পালিশ ঘষে ঘষে তুলে শ্রমসম্পর্কের ভেতর ক্ষমতার কদর্য রূপ মধ্যবিত্ত কর্মদাতার চোখের সামনে আয়না ধরে দেখিয়ে দেয় এই ছবি।

পঙ্কজ জোহারের ‘সিসিলিয়া’ ছবিটি দিনাজপুরের সিসিলিয়া হাঁসদা-র লড়াইকে ঘিরে। সিসিলিয়া হাঁসদা নিজে পরিযায়ী গৃহশ্রমিক। তাঁর মেয়ে ১৪ বছরের মতি মুর্মু পাচার হয়ে গৃহশ্রমিকের কাজে জুতে যায় মায়ের অজান্তেই। দিল্লী শহরের এক বাড়িতে পাওয়া যায় তার লাশ। মেয়ের জন্য, এক অর্থে সমস্ত এমন মেয়েদের জন্য, সিসিলিয়া অসম লড়াই চালান এক নিষ্ঠুর, অমানবিক, বর্বর ব্যবস্থার সমস্ত কলকব্জার বিরুদ্ধে। এরই মাঝে জীবনের রঙ্গমঞ্চে ঘটে নানা ঘটনা। যা দেখিয়ে দেয় উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের এই বিষয়ে চরম উদাসীনতা। কখনও নিষ্ঠুর কৌতুক হয়ে তা ফুটে ওঠে। সিসিলিয়ার লড়াই ও তার পরিণতি আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। লজ্জায় মাথা নিচু করে দেয়।’

সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্পার্টাকাস আন্দোলন করেছিলেন ‘ক্রীতদাস’ প্রথা বিলোপের। আমাদের বাংলায় ‘বর্গাদার প্রথা’ বিলোপ আইন করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বামপন্থীদের আন্দোলনের ফলে এই আইন তৈরি হয়েছিল এমনটা দাবি করেন বামফ্রন্ট নেতৃত্ব। কিন্তু গৃহপরিচায়িকাদের নিয়ে বামফ্রন্টের দলগুলি এত উদাসীন কেন? হা ক্লান্ত ওইসব পরিচারিকাদের সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্ব দাবি করে বামফ্রন্ট আমল থেকেই এই বাংলার গৃহপরিচারিকারা বাবুদের ‘ভালো ব্যবহার’-এর আড়ালে অন্যভাবে ব্যবহৃত হয়। অন্য কাজেও তাঁদের নিয়োগ করা হয়। সরলতার সুযোগ নিয়ে পরিশীলিত বাবু-বিবিরা বিভিন্ন কাজে ওদের ব্যবহার করে থাকেন। বহু ক্ষেত্রেই সাধারণ এবং নিম্নবিত্ত থেকে আসা আমাদের পরিচিত পরিচারিকার দল সমাজের দ্বারা প্ররোচিত হতে বাধয হয়।

 

Leave a comment

Filed under Uncategorized