বিদেশী সিংহের নীরব সামাজিক দৌড়

বিশ্বের যে কোনও দেশে যাই আন্তর্জাতিক সুনাম আছে এমন কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম আমরা শুনতে পাব। সেইসব উল্লেখযোগ্য অসরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে কয়েকটি আছে যারা নীরবে কিছু সামাজিক কাজ করে থাকে। সামাজিক কাজ করার ক্ষেত্রে কেউ কোনওদিন সীমানা প্রাচীরের কথা ভাবে না। আজ আমরা শতাব্দী প্রাচীন এমনই একটি সংস্থাকে বেছে নেব। শিরোনাম থেকে একটা অনুমান হয়ত করা যায় কিন্তু সবটা নয়। ভারতে গুজরাটের ‘গীর’ অভয়ারন্যের সিংহের গল্প ফেঁদে আমি বসতে চাইনি। আমাদের সিংহ মানব সভ্যতার কল্যাণে ১০০ বছর কাজ করছে। এই সিংহ আমেরিকা থেকে ভারতে তথা কলকাতায় এসেছে। সিংহের নাম ‘Lions Clubs International, District 322B2’, সম্প্রতি এই ক্লাবটির উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম ‘ব্লগার্স মিট’ হয়ে গেল। বিষয়টি অত্যন্ত অভিনব ছিল। ৩ জুন দেশপ্রিয় পার্কে ২৪ জন তরুণ। যারা মূলত ইংরেজি ভাষায় ব্লগ লেখেন। এবং ১ জন প্রবীণ ব্লগার। তিনি বাংলা ভাষায় ব্লগ লেখেন। মোট ২৫ জন ব্লগারদের নিয়ে দু’ঘণ্টার আলোচনাসভার আয়োজন করে লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশন্যাল ৩২২বি২।

আলোচনার শুরুতেই ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর লায়ন্স কিশোর পোদ্দার বলেন, ‘’আমাদের সংগঠন ১০০ বছরের পুরনো। এই ক্লাবে কোনও ধর্ম, কোনও জাতি, সম্প্রদায় নয়। যে কোনও মানুষ এই ক্লাবের সদস্য হতে পারেন। বিশ্বের সব থেকে বড় সংগঠন আমাদের এই এনজিও। আমাদের উদ্দ্যেশ্য সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে আলোয় নিয়ে আসা। আজ আমরা গর্বিত আমাদের সঙ্গে ২৫ জন ব্লগার আছেন। আমরা আশা করব আপনারা যারা ব্লগ লেখেন তারা রাজ্যের সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের কথা আপনাদের ব্লগের মাধ্যমে আমাদের জানাবেন। আমরা চেষ্টা করব আমাদের টিমকে সেখানে পাঠাতে।‘’

ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর লায়ন্স কিশোর পোদ্দারের বক্তব্যের সময়ে আমরা স্লাইড শো থেকে জানতে পারছি মাত্র তিন বছরে ১০০ মিলিয়ন মানুষকে লাইন্স ক্লাব বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা পৌঁছে দিতে পেরেছে। সামনের দিনে টার্গেট ২০০ মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌছনো। মূলত সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষকে বিভিন্ন পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে #Lions Club of Rabindra Sarovor, Lions Clubs International, District 322B2- এর নেতৃত্বে। কলকাতা শহর জুড়ে রয়েছে #Lions Club of Rabindra Sarovor- এর মত লায়ন্স ক্লাবের বিভিন্ন শাখা। সমস্ত শাখা সংগঠনের কাজগুলির মধ্যে আছে বৃদ্ধাবাস নির্মাণ এবং পরিচালনা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মহিলাদের স্বশক্তিকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বহুজাতিক সামাজিক দায়বদ্ধতা ( CSR)-র আলোকে কাজ করা। এবং সেই সঙ্গে অবশ্যই জনসংযোগ। এই কাজের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘Temple of Service’. যারা এই ক্লাবের সদস্য হতে পারবেন না বা হওয়ার মত আর্থিক ক্ষমতা নেই তাঁদের জন্য আলাদাভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া তরুণদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার সুযোগ। এদিনের আলোচনা সভায় আমরা এই ঘোষণা শুনতে পেলাম।

এই সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি শনি এবং রবিবার কিছু পথশিশুর খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সংস্থা সূত্রে খবর, পথশিশুদের জন্য কাজ করে এমন একটি পৃথক সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদোগে কাজ করছে লায়ন্স ক্লাব। ওই সংস্থা বছরে ২০ লাখ পথশিশুর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে। ৫ লাখ শিশুর খাবারের ব্যবস্থা করে লায়ন্স ক্লাব ডিস্ট্রিক্ট ৩২২বি২। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর মাধ্যমে এই সংস্থা পথশিশুদের অপুষ্টির বিষয়টাতে বিশেষ নজর দিয়ে থাকে। পথশিশুদের স্কুলছুটের দিকেও নজর দিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ দল। ৫০ টা স্কুল কলকাতায় চালাচ্ছে বিদেশি সিংহের খোলা খাঁচায় থাকা ৫০জন শিক্ষক। যদিও তারা স্বল্প বেতনের পার্টটাইমার। ক্লাবটি পথশিশুদের পড়াশোনার জন্য সব বইয়ের ব্যবস্থা করে। মাদকাসক্তদের মধ্যেও কাজ করছে এই ক্লাবটি। নজর রয়েছে স্বচ্ছ পরিবেশের ক্ষেত্রেও। কলকাতা শহরে যান নিয়ন্ত্রনে কয়েকশো ‘রোড ডিভাইডার’ সংস্থাটি কলকাতা পুরসভাকে দিয়েছে। এই ‘রোড ডিভাইডার’-এর মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে আর প্ল্যাস্টিক ব্যবহার করবেন না ‘Say No  Plastics More’। জুটব্যগ ব্যবহার করুন। এছাড়া আলাদাভাবে এই প্রচার নিজেদের স্বেচ্ছাসেবী এবং স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে করানো  হচ্ছে। শহরের পরিবেশ সবুজ রাখতে লাইন্স ক্লাবের উদ্যোগে ১ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে।

সংগঠনের পাইলট প্রোজেক্ট বিষয়ে বলেন লায়ন্স জিভ দয়া। লায়ন্স অলোক খৈতান ব্লগারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘’আপনারা আমাদের রাষ্ট্রদূতের কাজ করতে পারেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ বিভিন্ন খেত্রে আপনারা কমিউনিটি লিডারশিপের কাজ করতে পারেন। আমাদের ক্লাবের সদস্য হতে হবে না। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সেতু তৈরি করতে পারেন আপনারা।‘’

সহ ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর (২) লায়ন্স অরুণ জৈন বলেন, ‘’ যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে আমাদের প্রতিনিধি হিসেব সহেলী চক্রবর্তী অত্যন্ত ভালো কাজ করছে। আমরা যে কোনও গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য চোখের চিকিৎসার খরচের সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে থাকি। বিনাব্যয়ে এই চিকিৎসা লায়ন্স ক্লাব করে থাকে। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে কতৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের চোখ পরীক্ষার ব্যবস্থা করি। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। প্রতি রবিবার এবং ছুটিরদিনে ক্যম্প করা হয়। প্রতি বছর ৫০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হয়। ১০০ জনের চাকরির ব্যবস্থাও এই ক্লাব থেকে করা হয়ে থাকে।‘’

ভাইস ডিস্টিক্ট গভর্নর লায়ন্স সুধা জয়সওয়াল বলেন, ‘’আমাদের ক্লাবে নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এই ক্লাবের মহিলা সদস্য প্রায় ৩০ শতাংশ। আমরা এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ মহিলা সদস্য করতে চাই। এই টার্গেট নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছি। ৪ টে কর্মশালার আয়োজন করেছি। আপনারা জানলে আপনাদের ভালো লাগবে। আন্তর্জাতিক লাইন্স ক্লাবের এবার প্রথম মহিলা প্রসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।‘’

ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর লায়ন্স কিশোর পোদ্দার আরও বলেন, ‘’কলকাতার কাছাকাছি একটি জেলায় আমরা ১৮ কাঠা জমি পেয়েছি। সেই জমিতে আমরা বৃদ্ধাবাস গড়ে তুলছি। এই প্রকল্প গড়ে তুলতে আমরা ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন সব রকমের সাহায্য করবেন। আমরা ২৫ জন ব্লগার নিয়ে যে আলোচনা সভা করলাম, জানি আমাদের আলোচনার খবর আপনারা বিশ্বের মানুষের কাছে পোছে দেবেন। আমাদের শ্লোগান ‘’We Serve’’.

‘ব্লগার মিট’ অনুষ্ঠান শুধু নয়। লায়ন্স ক্লাব ৩২২বি২ শাখার নেপথ্যের কারিগড় আসলে একজন নারী। তিনি সহেলী চক্রবর্তী। বেসরকারি সংস্থার অত্যন্ত দক্ষ একজন জনসংযোগ অফিসার। তাঁর চিন্তা এবং উদ্যোগেই এদিনের এই অনুষ্ঠান। সহেলী সম্পর্কে আমাদের বলেছেন অরুণ জৈন। লায়ন্স ক্লাবের তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার সব দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিয়েছেন সহেলী। শুধুমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। এদিনের পুরো অনুষ্ঠানটা পরিচালনা করেন সহেলী চক্রবর্তী।

 

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

নতুন নির্বাচনবিধির প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের

সারাদেশে একসঙ্গে ভোট করানোর প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে লোকসভা, রাজ্যসভা এবং বিধানসভার ভোট একসঙ্গে করাতে পারলে অনেকগুলি সুবিধা পাওয়া যায়। আইন কমিশন থেকে একটি প্রস্তাব বেশ কিছুদিন আগে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। ‘’এক জাতি এক এক নির্বাচন’’-এর প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আইন কমিশনের থেকে পাওয়া একটি চিঠির প্রসঙ্গে গত ২৪ এপ্রিল এই প্রস্তাবটি আনা হয়। প্রস্তাবে লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে সমস্ত রাজ্য নির্বাচন সমন্বয় করার জন্য নির্বাচন কমিশনের মতামত চাওয়া হয়। নির্বাচন কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে ‘’এক বছর এক নির্বাচন’’।

পাঁচটি সাংবিধানিক বিষয়সমূহের উপর এবং ১৫ টি সভ্যতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলির উপর নির্বাচন কমিশনের কতটা প্রভাব রয়েছে? সূত্রের খবর, আইন কমিশন এই বিষয়ে জানতে চেয়েছে। যার উপর নির্ভর করছে ‘’এক বছর এক নির্বাচন’’। এবং এই বিধি চালু করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বিষয়গুলির তথ্য। নির্বাচন কমিশন সূত্রে আরও খবর, বছরে একবার নির্বাচন করতে পারলে দেশে ‘রাজনৈতিক’ এবং ‘অর্থনৈতিক’ স্তরে পরিবর্তন আসতে পারে। যদি এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ে তাহলে লোকসভার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য বিধানসভা এবং রাজ্যস্তরের অন্যান্য নির্বাচন একই সঙ্গে করাতে হবে। প্রাসঙ্গিক আলোচনার সময় লক্ষ করা যাচ্ছে কিছু রাজ্য সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষের পথে। সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী একটি রাজ্যের পুনরায় নির্বাচনের জন্য পূর্ববর্তী সরকারের মেয়াদ ফুরানোর ছয়মাস আগে জানানোর নিয়ম। একবছরে একবার নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সুবিধজনক হতে পারে। এমনটাই মত নির্বাচন বিষেশঞ্জদের। এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধিবদ্ধ নির্বাচনের মতো অনেকগুলি আইনি সংশোধনী প্রয়োজন হবে না। আইন কমিশন সূত্রে খবর, এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রকে সংবিধানের পাঁচটি সংশোধন করলেই হবে।

যদিও কেন্দ্রীয়সরকার এই নির্বাচন বিধি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনকে বিরোধী দলগুলির সঙ্গে কথা বলতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকার, বিরোধীদলগুলির মধ্যে ঐক্যমত গড়ে উঠলে তবেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

পরিবেশ আন্দোলনের বলি ৯

পরিবেশ নিয়ে পরিবেশবিদ্রা যতটা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, সেই তুলনায় ভারতের সাধারন মানুষ কতটা সচেতন? সম্প্রতি কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গে ‘ভাগাড়ের মাংস ‘ নিয়ে যে কান্ড ঘটে গেল সেটাকেও কি খুব কম কিছু বলা যায়? ক্লাকাতার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে মঙ্গলবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা নেটীজন্রা জান্তে পারলাম তামিলনাড়ুর তুতিকোরিনে স্টারলাইন কপার কারখানা বন্ধের দাবিতে যে আন্দোলন হচ্ছিল সেই আন্দোলনের সমর্থকদের উপর পুলিশ গুলি চালায়। খবরে প্রকাশ পুলিশের গুলিতে এ পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আজ আরও একজনের মৃত্যুর খবর এসে পৌঁচেছে। সে নাকি ভয় এবং আতঙ্কে মারা গেছে। সংবাদ সংস্থা এমণটা জানাচ্ছে। এটাকেই কি ভারতে পরিবেশ আন্দোলনের একুশ শতাব্দীর স্ব থেকে বড় আন্দোলন বলব আমরা? মৃত্যু একজনের হোক বা ৯ জনের। সাধারণ মানুষের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করা উচিৎ নয়। ঘটনা কি ঘটেছিল? স্টারলাইট কপার কারখানা থেকে অঞ্চলের পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বাড়ছে দূরারোগ্য রোগ ব্যাধি। এই অভিযোগে ১৮টি গ্রামের মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। বহিরাগতদের থাকার কথাও জানা যাচ্ছে। টানা ১০০ দিন ধরে চলা এই বিক্ষোভকে ঠেকাতে রাজ্য প্রশাসনকে শেষ পর্যন্ত গুলি চালাতে হল? সমস্যা কতটা গভীরে গেলে এই প্রিস্থিত তৈরি হয়? বহুজাতিক সংস্থাটি এই ঘটনার পরে সত্যি সত্যি কি সংস্থা গুটিয়ে নেবে? সমাজে দূষণ যেমন একটা সমস্যা আবার কল কারখানা না হলে স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। বেদান্ত স্টারলাইট সংস্থা এই দুরঘটনার পরে ব্যবসা গুটিয়ে নিলে অঞ্চলের মানুষ কাজ হারাবে। স্থানীয় মানুষ এবং পরিবেশ আন্দোলনকারীদের অভিযোগ তামার কারখানা থাকার জন্য এলাকায় গলা ও চোখের ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সূত্রের খবর এ বছর ২৯ মার্চ থেকে কারখানাটি কতৃপক্ষ বন্ধ করে রেখেছিলেন। ১৫ দিন বন্ধ ছিল। কতৃপক্ষ বলছে ্রখণাবেখণের কাজের জন্য বন্ধ ছিল। আন্দোলন এমন একটা ভয়ঙ্কর জায়গায় কি গিয়েছিল? যদি ধ্রেও নেওয়া যায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কারখানা কতৃপক্ষের বিরোধ চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল। এটা হবে কেন? স্থানীয় রাজনৈতিক দল, প্রশাসন কি চুপ করে বসে ছিল? আমরা জানতে পারছি বিক্ষোভের আঁচ বৃটেনেও গিয়ে পৌঁছেছিল। এই খবর জানার পরেও রাজ্য প্রশাসন সতর্ক হল না কেন? প্ররোচনা কোনদিক থেকে এল? এতগুলি প্রশ্নের উত্তর পেলে তবেই তূতীকোরিনে শান্তি ফিরতে পারে। আন্দোলন প্রতিবাদ একটা অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার নামে মাদের সতর্ক থাকতে হবে রাজনীতির ঘলা জলে কেউ মাছ ধরতে চাইছে কিনা।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

রাষ্ট্রপতি পদে নিকোলাস

ঝঞ্ঝা বিদ্ধস্ত ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর উপর ভরসা রাখলেন সেই দেশের সাধারণ নাগরিক। নিকোলাস মাদুরো  রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হবার পর সোমবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করলেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত অগাস্টো মুনিটেল। এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে অগাস্টো জানান, ভারত এবং ভেনেজুয়েলার মধ্যে ভাতৃপ্রতিম সম্পর্কের কথা। এবং তাঁর পরেই তিনি চলে যান নিজের দেশের সদ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত খবরে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ”তাঁর দেশের কঠিন সময়ে ভারতের মানুষ,ভারত সরকার তাঁদের পাশে ছিল। এজন্য ভেনেজুয়েলা গর্বিত। আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

রাষ্ট্রদূত অগাস্টো মুনিটেল-এর এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কিউবা, ব্লিভিয়া, ইকুয়াডোর এবং সুরিনামের রাশট্রদূতেরা। গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রশাসনের ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ব্লিভিয়ার রাষ্ট্রদূত এইচ ই সারজিয়ো আরিপে। তাঁর কথায় আমেরিকার নেতিবাচক এই প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। সমস্ত সঙ্কটের উরধে উঠে ভেনেজুয়েলার মানুষ যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সেই বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি অভিনন্দন জানান। তাঁর বার্তায় তিনি বলেন, ”আমি ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের আত্মধিকার বিষয়ে ওই দেশের মানুষের লড়াইয়ের মান্সিক্তাকে কুর্ণিশ জানাচ্ছি।”

২০ মের নির্বাচনে ভেনেজুয়েলার লড়াকু মানুষদের এই জয়কে অভিনন্দন জানান কিউবার রাষ্ট্রদূত। সুরিনামের রাষ্ট্রদূত ভেনেজূয়েলা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন এদিনের দিল্লির সাংবাদিক বৈঠকে। তিনি তাঁর দেশের রাষ্ট্রপতির পাঠান অভিনন্দনবার্তা তুলে দেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূতের হাতে। সূত্র- সংবাদ সংস্থা

Leave a comment

Filed under Uncategorized

ক্যামেরার চোখে গ্রাম সংসদ

টানটান উত্তেজনার মধ্যে অবশেষে রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোটের দিন আমরা পেলাম। ১৪ মে একদিনের ভোট নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। রণক্ষেত্র তৈরি করতে সরকার এবং বিরোধী দলগুলি আইনি যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। এটাই দস্তুর বা স্বাভাবিক। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্র। পঞ্চায়েত নির্বাচনে সময় কিনতে বিরোধী দলগুলি আদালতের কাছে আবেদন জানায়। আলোচ্য পঞ্চায়েত নির্বাচন আদালত পর্যন্ত গড়ানোর আগে নির্বাচন কমিশন ১, ৩ ও ৫ মে তিন দফায় ভোট গ্রহণের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছিল। দীর্ঘ সময় আইনি টানাপড়েনে কেটে যাওয়ার পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোট গ্রহণ একদিনে এসে দাঁড়াল। নির্বাচন কমিশন ভোট গণনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সঠিকভাবেই বলেছিলেন, ‘’আমরা খুব খুশি। গণতন্ত্র অনুযায়ী অন্তত নির্বাচনটা হোক। আমরা চাই, শান্তিপূর্ণ ভাবে, সুন্দর ভাবে ভোটের কাজ সম্পন্ন হোক।‘’

এবছরের পঞ্চায়েত ভোটের দিন ঘোষণার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বচ্চো আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ই-মনোনিয়ন বিষয়ক কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে ‘ব্যাড অর্ডার’ বলে মন্তব্য করেছে। সংবাদ মাধ্যম লিখছে, ‘’পঞ্চায়েত ভোটে ই- মনোনয়নকে বৈধতা দিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল বৃহস্পতিবার তার উপর স্থগিতাদেশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। ফলে ১৪ মে ভোট হতে আর বাঁধা থাকল না। এ দিন হাইকোর্টের রায়কে ‘ব্যাড অর্ডার’ বলে মন্তব্য করেছেন শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু একই সঙ্গে ৩৪% আসনে ভোট ছাড়াই প্রার্থীদের জিতে যাওয়ার ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে রাজ্য নির্বাচনকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, আদালতের অনুমতি ছাড়া ওই সব আসনের ফল ঘোষণা করে সরকারি বিঞ্জপ্তি করা যাবে না। আগামী ৩ জুলাই এ বিষয়ে ফের শুনানি হবে।‘’ (সূত্র- আঃ বাঃ পঃ, ১১মে, ২০১৮)

ই-মনোনয়ন বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রার্থী অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার নোদাখালি থানায় অভিযোগ জানিয়েছে সিপিএম। ৯ মে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘’ই-মনোনয়ন কারা দিয়েছেন, সেই নামধাম জমা ছিল কমিশনের কাছে। জমা দেওয়া হয়েছিল আদালতেও। সে সব প্রার্থীর তথ্য বাইরে বেরোতেই হুমকি শুরু হয়েছে।‘’

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভার সদস্য এবং জেলায় দলের তরফে ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত শুভাশিস চক্রবর্তী বলছেন, ‘’ই-মনোনয়ন কারা দিয়েছেন, তা জানার সুযোগ নেই এবং আমরা জানিও না। সন্ত্রাসের ভুয়ো অভিযোগের মতো ওটাও ভিত্তিহীন।‘’

শুধুমাত্র পঞ্চায়েত নির্বাচন নয়, বিধাসভা বা লোকসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণার পর সরকার এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে একটি আইনি লড়াই শুরু হয়ে যায়। আমাদের ঞ্জান হওয়ার পর থেকে আমরা এটাই দেখে আসছি। ১৯৭৮ সালের নব পর্যায়ের ত্রিস্ত্রর পঞ্চায়েত (গ্রাম সংসদ) পশ্চিমবঙ্গে আসার পর থেকে বাংলার গ্রামের শাসন ক্ষমতা কাদের হাতে থাকবে? এই প্রশ্নে সচেতন মোড়ল, ক্ষমতাচ্যুত জোতদার, শিক্ষিত বাম রাজনীতির শিক্ষক, অশিক্ষিত বর্গাদার নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করে। শাসন ক্ষমতা হারানো ‘ইউনিয়ন বোর্ড’-এর চতুর গ্রাম প্রধান তথা সামন্তপ্রভুর দল ধীর ছন্দে বামফ্রন্টভুক্ত দলগুলিতে আশ্রয় নিতে থাকে। কারণ ওই সব স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাদী চতুর সামন্তশ্রেণী আগেই বুঝে গিয়েছিল আধুনিক পঞ্চায়েত হবে ক্ষমতা এবং অর্থের কেন্দ্র। সিপিএম তথা বামফ্রন্ট আধুনিক ‘গ্রাম পঞ্চায়েত’-এর রুপকার হিসাবে যে দাবি করে সেটা তাত্ত্বিকভাবে কতটা সঠিক সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ লেনিনের রাশিয়ায় যেমন আধুনিক গ্রাম পঞ্চায়েতের মডেলের কথা আমরা জানি। পাশাপাশি কংগ্রেস নেতা তথা ভারত নামক  আধুনিক গণতন্ত্রের রুপকার তথা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর ‘দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে ভারতের গ্রামপঞ্চায়েত তথা দেশের শাসন ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ সেই বিষয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন। শাসন ব্যাবস্থা বিষয়ক আলোনায় পণ্ডিত নেহরু তাঁর বইয়ে বেছে নিয়েছিলেন চন্দ্রগুপ্ত এবং চাণক্যকে (কৌটিল্য)। কৌটিল্যের সঙ্গে  চন্দ্রগুপ্তের পরস্পরের সম্পর্কের বিষয়কে। তিনি লিখছেন,

‘’There was hardly anything Chanakya would have refrained from doing to achieve his purpose; he was unscrupulous enough; yet he was also wise enough to know that this very purpose might be defeated by means unsuited to the end. Long before Clausevvitz, he is reported to have said that war is only a continuance of state policy by other means. But, he adds, war must always serve the larger ends of policy and not become an end in itself; the statesman’s objective must always be the betterment of the state as a result of war, not the mere defeat and destruction of the enemy. If war involves both parties in a common ruin, that is the bankruptcy of statesmanship. War must be conducted by armed forces; but much more important than the force of arms is the high strategy which saps the enemy’s morale and disrupts his forces and brings about his collapse, or takes him to the verge of collapse, before armed attack. Unscrupulous and rigid as Chanakya was in the pursuit of his aim, he never forgot that it was better to win over an intelligent and high-minded enemy than to crush him. His final victory was obtained by sowing discord in the enemy’s ranks, and, in the very moment of this victory, so the story goes, he induced Chandragupta to be generous to his rival chief. Chanakya himself is said to have handed over the insignia of his own high office to the minister of that rival, whose intelligence and loyalty to his old chief had impressed him greatly. So the story ends not in the bitterness of defeat and humiliation, but in reconciliation and in laying the firm and enduring foundations of a state, which had not only defeated but won over its chief enemy.’’ Chapter 4: The Discovery of India, Chandragupta and Chanakya: The Maurya Empire Established (Pages 122-124)

 

যদিও আধুনিক সমাজবিঞ্জানীরা বলে থাকেন ভারতে আধুনিক গ্রামপঞ্চায়েত ত্রিস্তরে ভাগ করে একটি গনতান্ত্রিক ‘গ্রামসংসদ’-এর উচ্চতায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই বামফ্রন্ট সরকারের। আমার মনে পড়ছে ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্বে প্রথম ত্রিস্তর গ্রামপঞ্চায়েত নির্বাচন। নকশালপন্থী আদর্শবাদী নেতৃত্ব জেল থেকে বেরিয়ে আসছেন। সেই বছর বামফ্রন্ট সরকার মাত্র এক বছর ক্ষমতায় এসেছে। রাজ্যে কংগ্রেসের দাপুটে নেতার দল বিভ্রান্ত। আত্মগরিমা ভেঙে পড়ছে। রাগে ক্ষোভে ফুটছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী স্থানীয় জোতদার শ্রেণী কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে জলমাপা শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তারা। হঠাৎ আছড়ে পড়া কালবৈশাখী ঝড়ের মত পঞ্চায়েত ভোট এসে পড়ল। শান্ত গ্রাম ধীরে ধীরে তেতে উঠল। স্থানীয় মোড়লের দল পিছিয়ে এল। ছদ্ম আভিজাত্য ভেঙে পড়ল। আমরা সদ্য যৌবনে উত্তীর্ণ যুবকের দল সন্ত্রস্ত চাউনি নিয়ে সমাজ পরিবর্তন দেখলাম। কংগ্রেসের কেউ কেউ ‘গ্রামসভা’, ‘গ্রাম সংসদ’ গড়ে তোলার নতুন প্রস্তাব নিয়েও তখন ভাবনা চিন্তা শুরু করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল নির্বাচিত গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যরা স্থানীয় সৎ তথা গ্রামের বুদ্ধিজীবী মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি করবে। যে কমিটিকে ‘গ্রামসভা’ বা ‘গ্রাম সংসদ’ বলা হবে।

উত্তর আধুনিক ভারতে পঞ্চায়েতের কাজ কেমন হতে পারে সেটা আমরা জানতে পেরেছি ৩১ বছরের ছবি রাজওয়াতের কাছে। পুণের নামী ইন্সটিটিউট থেকে মানেজমেন্ট পাশ করা কৃতি ছাত্রী তিনি। ২০১১ সালে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় চাকরির সুখ স্বাচ্ছন্দ ছেড়ে পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী হয়ে জিতে যান। জয়পুর থেকে ৬০ কিলোমটার দূরের গ্রাম ‘সোডা’ গ্রামপঞ্চায়েতের ভোটে লড়েন ছবি। এবং পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে কি কাজ করেছেন? সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর, পরিচ্ছন্ন ৯০০ বাড়ি, প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে পাকা শৌচালয়। ৪০টি প্রধান রাস্তাই পাকা। প্রতিটি বাড়িতে জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করেছেন ছবি রাজওয়াত। এবং সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। এক বছর আগের খবর থেকে জানা যায় একটি গ্রামের উন্নয়ন কতটা করা যায় সেটা উদাহারণ হয়ে আছে রাজস্থানের ‘সোডা’ নামক গ্রামটি। ‘স্মার্ট ভিলেজ’ বললে খুব কিছু ভুল বলা হবে কি? আদর্শ গ্রামপঞ্চায়েত বলতে সম্ভবত এই উন্নয়নকে বলতে হয়।

সেই ‘গ্রাম সংসদ’ গ্রাম পঞ্চায়েতে থাকলেও উল্লেখিত সংসদের পঞ্চায়েত চালানোর ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা থাকে? প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সাংবাদিক হিসেবে আমি ২০০৩ এবং ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট স্বক্রিয়ভাবে কভার করেছি। নিজের একলাখ টাকা দামের ক্যামেরা (Sony PC 9E’) নিয়ে একা একা কাজ করার আমার অভিঞ্জতা হয়েছিল। সেই ক্যামেরা আমার ঘরে এখনও রয়েছে। আবার সঙ্গে  অফিস ক্যামেরা এবং ক্যামেরম্যান সঙ্গে নিয়েও কাজ করেছি।  পঞ্চায়েত ভোটের এক বছর আগে থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গিয়ে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, গোষ্ঠী সংঘর্ষের খবর আমাদের করতে হয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটের এক বছর আগে থেকে সংবাদ মাধ্যম গ্রামাঞ্চলের খবর করতে শুরু করে। ২০০৩ সালে আমি ‘জি নিউজ’-এর সংবাদদাতা হিসেবে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার দায়িত্বে আসি। আজ থেকে ১৫ বছর আগে সুন্দরবন অঞ্চল এখনকার মত এতটা উন্নত ছিল না। তখন পরিকাঠামো প্রায় ছিলনা বললেই চলে।

সেই কারণে আমরা সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা কখনও কাকদ্বীপে তৃণমূল দলের পার্টী অফিসে রাত কাটাতাম। একটা চৌকির উপর একটা শতরঞ্চি। ব্যবস্থা করতেন বর্তমান রাজ্য সরকারের সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা। সাগরে থাকার ব্যবস্থা করতেন বিধায়ক বঙ্কিম হাজরা। পাথরপ্রতিমা, কুলতলি, মৈপীঠ সহ একাধিক প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিনের পর দিন থাকেতে হয়েছে। বাসন্তী, সোনাখালী, গোসাবা প্রভৃতি অঞ্চলে আমাদের ঘুরতে হয়েছে। পিয়ালি থেকে পাথর প্রতিমা। বজবজ থেকে বুড়িগঙ্গা অথবা মুড়িগঙ্গা। নামখানা-চন্দনপিঁড়ি গ্রাম (তেভাগা আন্দোলন খ্যাত)। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার এমন কোনও ব্লক নেই আমি যে ব্লকে খবর করতে যাইনি। সেইসব ব্লকের বা অঞ্চলের এসইউসি, আরএসপি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএম নেতৃত্ব আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করতেন। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার মত কোনও হোটেল ছিল না।

আমি  সেই সময়কালের একটি খবরের খসড়া এই লেখায় উল্লেখ করছি। Slug: Ramganga G.P, Date: 21/04/04, V.O.- (1) দঃ ২৪ পঃ জেলার পাথরপ্রতিমা ব্লকের সিপিআইএমের পাঁচজন সদস্য পরিচালিত গ্রাঃ পঃ-এ অনাস্থা প্রস্তাব আনল তৃণমূল এবং কংগ্রেসের ১০জন পঞ্চায়েত সদস্য।

বাইটঃ ফণীভূষণ গিরিঃ ব্লক সভাপতি, কংগ্রেস, পাথরপ্রতিমা

বাইটঃ রাধেশ্যাম পণ্ডিত, সদস্য টিএমসিপি, পাথরপ্রতিমা

V.O.- (2)- অনাস্থা প্রস্তাব আনার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা বিভিন্ন উপসমিতি গঠনের ক্ষেত্রে টাই। এবং রামগঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের সেক্রেটারিকে দুর্নীতির অভিযোগে বি ডি ও-এর শোকজ নোটিশ।

বাইটঃ কার্তিক চন্দ্র বেড়া, সেক্রেটারি, রামগঙ্গা গ্রামপঞ্চায়েত

বাইটঃ সন্তোষ দাসঃ প্রধান, সিপিআইএম, রামগঙ্গা গ্রামপঞ্চায়েত

V.O.-(3)-গত ২০০৩-০৪ আর্থিক বছরে রামগঙ্গা গ্রামপঞ্চায়েতে কোনও রকম অডিট হয়নি। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিআইএম তিনটি দলের মধ্যে রয়েছে টানটান উত্তেজনা। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ার সুবাদে যে কোনও মূহুর্তে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বেঁধে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মানুষেরা।

বাইটঃ সৌমেন হোড়, যুগ্ম সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক, পাথরপ্রতিমা।

আমার একটি লেখা নিবন্ধ ৩ নভেম্বর ২০০৩ সালে সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়। নিবন্ধটি সাগরে দুর্নীতি নিয়ে। কিছুটা কৌতুকের আশ্রয় নিয়ে লেখাটি লিখেছিলাম। বোটখালি নামক অঞ্চলের ভাঙ্গন এবং সেই ভাঙ্গনের জন্য বরাদ্দ টাকা পঞ্চায়েত সমিতিতে নিয়ে আসার জন্য লড়াইয়ের গল্প আমি লিখেছিলাম। ওই দিনের সম্পাদকীয় পাতায় ‘অতিথি লেখক’ কলমে ‘সাগরযাত্রা’ শিরোনামে লেখাটি প্রকাশ হয়েছিল। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নীতি আয়োগ সূত্রে খবর, ভারতে ১১৫টি জেলাকে পিছিয়ে পড়া এলাকা হিসেবে নীতি আয়োগ চিহ্নিত করেছে। ২০০৭ সালে ইউপিএ সরকার ২৭২টি জেলাকে পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। উন্নয়নের জন্য ওইসব জেলায় কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ করে মনমোহন সিংহের সরকার। উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। সেই প্রকল্পের নাম ছিল ‘ব্যাকওয়ার্ড রিজিওনাল গ্র্যান্ট ফান্ড’ (বিআরজিএফ)। দারিদ্র, পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই চারটি বিষয়ে পিছিয়ে থাকার মাপকাঠিতে জেলাগুলির নাম উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক ১১৫টি জেলার প্রকাশিত তালিকায় আমাদের রাজ্যের বীরভূম এবং মুরশিদাবাদের নাম রয়েছে। বাদ পড়েছে বণিকসভা অ্যাসোচেমের অনগ্রসর জেলার তালিকায় থাকা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, কোচবিহার এবং দার্জিলিং, চারটি জেলা। এই তালিকা ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আলিপুদুয়ারের কামাখ্যাগুড়ির সভায় বলেন, ‘’আরনিং হচ্ছে না শুধু বারনিং হচ্ছে। আমি তো বলতে পারি না গরিব লোককে চাল, বিনা পয়সার চিকিৎসা, স্কুলের অনুদান, শিক্ষাশ্রী, সবুজশ্রী বা কন্যাশ্রী দেব না?’’

ডিসেম্বর মাসে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানিয়েছিলেন, ১০০ শতাংশ বুথে কমিটি করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, বসিরহাটের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় সব বুথে কমিটি গড়া মুশকিল। ৯০-৯৫% বুথে কমিটি হয়ে যাবে আশা করি।‘’

তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামআঞ্চলে জোর প্রচার করছে ‘বাম-রাম’ জোট হয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, ‘’দলের মতাদর্শের বাইরে গিয়ে কোনও কর্মী বিজেপির সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত করলে তাঁদের পত্রপাঠ বহিষ্কার করা হবে।‘’

কংগ্রেসের বক্তব্য ঠিক কি? ২৫ এপ্রিল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাজ্যস্তরে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলন করতে রাজ্য কমিটির কোনও বাঁধা নেই। কিন্তু জাতীয়স্তরে কংগ্রেসের মমতাকে প্রয়োজন। কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ ২৫ এপ্রিল বলেন, ‘’মমতা একজন জনপ্রিয় নেত্রী। তার দলের নীতি ধর্মনিরপেক্ষ। আমরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

রাজ্যের ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট ‘রক্তস্নাত’ হবে না শান্তিপূর্ণ সেই আলোচনা গত কয়েক মাস থেকেই হচ্ছে। সরকারে থাকার সুবাদে তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামের উন্নয়ন করেনি এ কথা সৎ নাগরিক হিসেবে বলা যাবে না। আবার সৎ সাংবাদিক হিসেবেও বলতে হয় বাংলার গ্রামে উন্নয়ন হয়েছে। তবে কতটা? ‘স্মার্ট গ্রাম’ কি বলা যাবে? দুর্নীতি কি হচ্ছেনা? কংগ্রেস, সিপিআইএম এবং বিজেপি তাঁদের প্রচারে দুর্নীতিকে কতটা ইস্যু করতে পেরেছে? আমাদের জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৭ মে পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরনোর পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘’সবচেয়ে ভাল হল জনগণের। আমরা জনগণের পক্ষে। নির্বাচনের পক্ষে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক।‘’

Leave a comment

Filed under Uncategorized

এই শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-অধ্যাপকদের চিন্তা-মননে আজও ‘দেশভাগ’-এর উৎকণ্ঠা

ভারত নামক একটি বৃহৎ ভূখণ্ড যে বছর ভেঙে দু’টুকরো করা হল তখন আমার জন্ম হয়নি। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট মধ্যরাতের পরে আমি জন্মেছি। ১৯৫৮ সাল ধরলে ১১ বছর পর আমার দেশ খন্ডিত ভারতে আমার জন্ম। অবশ্যই আমার বাবা-মা বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর আমার জন্ম। তারপর উদ্বাস্তু হিসাবে তাঁদের সংগ্রামের, আবেগের গোবর লেপা আঙিনার গল্প শুনেছি। জল থৈ থৈ ডিঙি নৌকো, মোটা গাছের তৈরি ডিঙি নৌকোর বৈঠা টেনে টেনে আমার মা মাসিরা রান্না ঘর, শোবার ঘর, বৈঠকখানা ঘরে যাতায়াত করতেন। ‘ডিঙি নৌকো’ না পেলে সাঁতরে এই ঘর সেই ঘরে চলে যেতেন। এটা ছিল তাঁদের সহজাত সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের রোমান্টিকতা। তাই দেশ ভাগ তাঁদের অব্যক্ত ভাষায় প্রকাশ হত। ফেলে আসা স্মৃতি তাঁদের টেনে নিয়ে যেত। আমার এক বাঙাল বন্ধুর অধ্যাপক বাবা বলতেন, ‘দেশ ভাগ একবার হয়েছে কিন্তু বঙ্গভঙ্গ? আমাদের বাংলা  দু’বার ভাঙা হয়েছে। আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লীর দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত করা হল। লর্ড কার্জন যেমন পার্লামেন্টকে না জানিয়ে বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন, তেমনি রদ করার ব্যাপারেও পার্লামেন্টকে জানানো হয়নি।’

কল্লোলিত জলের, স্বচ্ছ জলের ঢেউয়ের শিশির-শিউলির আবেগ দেখেছি আমার বাঙাল আত্মীয়দের চোখের ভাষায়। মনের না বলা অম্লান প্রতিশব্দে। আমি নিজেও সাঁতার শিখেছি আমার মায়ের কাছে। সেই প্রশিক্ষণেই আমি সত্তর দশকে আমার মামার সঙ্গে পাটুলির গঙ্গা এপার ওপার করে সাঁতার কাটতাম। চোখে দেখেছি লক্ষ্মীর আলপনা আঁকা কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি, উঠোন-বারান্দায় লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। কলাগাছের মোটা খালি/খোল গোল করে নারকেল কাঠি দিয়ে দিয়ে আটকে দেওয়া হত। লক্ষ্মী পুজোর দিন। পাঁচটা এইরকম খোলের উপর লাল কাপড়ের শালু। লাল কাপড়ের উপর ধান, পাঁচটা কড়ি, দূর্বা, হলুদ-সিঁদুর জলে ভেজানো ধাগা। লক্ষ্মী পূজোর পর বাড়িতে ৫০-১০০ জনের পাত পড়ত। সুগন্ধি চাল, মূগ ডালের খিচুড়ি, পাঁচ মিশেলি সবজি, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, আলু, পটল, কুমড়ো, বেগুন ভাজা, ফুল কপির তরকারি, পায়েস, সন্দেশ সহযোগে। আমাদের বাড়িতে পাড়া ভেঙে পড়ত মায়ের হাতে রান্না খাওয়ার জন্য। কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই দলের বিভিন্ন দলের নেতা কর্মী আসতেন। নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা কানু সান্যাল সহ আরও অনেকে এসেছেন মায়ের হাতের রান্না খেতে। দেশভাগের এই স্মৃতি নিয়ে আমি বড় হয়েছি। এই রিচুয়াল, মূল্যবোধ, কৃষ্টি, বিয়ের গান দেখে শুনে আমি বড় হয়েছি। আমের মুকুলের গন্ধ শুকে বড় হয়েছি। কাসুন্দির ঝাঁজের তাড়া খেয়েও ছুটে গেছি ‘কাসুন্দির হাঁড়ির’ কাছে। ধব ধবে সাদা গায়ের রঙ, সাদা থান পড়া আমার দিদিমার কাছে। পিসিদের কাছে। যদিও আমি নিজে কালো মানুষের উপত্যকার বাসিন্দা। আমি নিজে আজও রাজনৈতিক এবং সামাজিক কারণে উদ্বাস্তু। আমার নিজের কোনও ঘর নেই। বাড়ি নেই। এটাই স্বাভাবিক। বাবার দেওয়া মোটা কাপড়/ খড়ের চাল দেওয়া মাটির বাড়ি কেড়ে নিলো কারা? কেড়ে নিলে সবার এই পরিস্থিতি হয়। তাই আজও উচ্চারণ করি। চিরকাল আবৃত্তি করব,  ‘ আহা! আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়ায় উঠতে দাও/ সেখানে বসে আমি মদ খাবো, তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে পড়ে;/ আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাবো, ভুলে যাবো, ভুলে যাবোঃ/আমি একজন কালো রঙের মানুষ, আমার জন্য এই সব।’ (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত নিগ্রো কবিতা থেকে।)

যত বড় হয়েছি, পশ্চিমবঙ্গে আমাদের যেখানে যত আত্মীয় আছেন সেই সব জেলায়, অঞ্চলে, জায়গায় ছুটে গিয়েছি। উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর, হাবড়া, বনগাঁ, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, নেতাজীনগর, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, মালদহ, কোচবিহার, কাটোয়া, পূর্বস্থলী, পাটুলি, ইছাপুর, গারুলিয়া, ব্যারাকপুর, খড়গপুর সহ আরও বিভিন্ন অঞ্চলে। কাসুন্দি, আম, কাঁঠাল, নারকেল, খেজুরের রস, খেজুরগুড়ের পিঠে-পায়েস এবং অবশ্যই ‘কলোনি ঘর-সংসার’ দেখতে বারে বারে ছুটে যেতাম। ‘বারোঘর এক উঠোন’ দেখতে। এই বাংলার ষাটের দশকে তখনও দগ দগ করছে উদ্বাস্তু কলোনি জীবনে ‘পূর্ববঙ্গের অভিধাত’। আমার স্মৃতি আমাকে চাবকায়। লোভ জাগে যদি একবার ছিটমহলে গিয়ে একুশ শতাব্দীর ‘উদ্বাস্তু কলোনি’ দেখি। খুব কাছে বারুইপুরে গিয়ে ‘রোহিঙ্গা কলোনি’ দেখলেও মানবযন্ত্রণার আলপনা আঁকা জীবন খুঁজে পাব। সিরিয়ার মানুষের যন্ত্রণার কথা শুনতে ইচ্ছে করে। মধ্য প্রাচ্যের যন্ত্রণা-দীর্ণ আধুনিক উদ্বাস্তু জীবনের শৈশব কৈশোরের চড়ুইভাতি দেখতে ইচ্ছে জাগে।কারণ আমি এই বাংলার রাজনৈতিক কারণে ‘ঘরছাড়া’-দের প্রত্যক্ষ করেছি। খবর করেছি। স্টোরি লাইভ করেছি। একুশ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাংলার উত্তাল রাজনীতির প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমরা যারা, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে যারা সক্রিয় সাংবাদিকতা করেছি তাঁরা ওইসব তাৎক্ষনিক ‘উদবাস্তু’দের খুব কাছ থেকে দেখেছি। বিষয়টা নিয়ে আজও সেভাবে লেখালেখি হয়নি।

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিল্ম স্টাডি’ এবং ‘নেতাজী ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ’, কলকাতা  বিভাগের উদ্যাগে দু’দিন (২২-২৩ মার্চ) ব্যাপি একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেমিনারের বিষয়সূচি ছিল, ‘Partion of India: Contemporary Perspectives, National seminar organized by Department of Film Studies, Jadavpur Univarsity and Netaji Institute for Asian Studies, Kolkata.’

বিবেকানন্দ (সুবর্ণ জয়ন্তী ভবন) সভাঘরে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। পর পর দু’দিন উপস্থিত থাকতে পারিনি। কিন্তু প্রথম দিনের বিদগ্ধ অধ্যাপক-শিক্ষক, ছাত্রদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তাঁরা উৎকণ্ঠা, উদ্বেগে রয়েছেন। পরে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানতে বুঝতে চেষ্টা করি। আবার কি খুব সন্তর্পণে আরও একটি দেশভাগের পরিকল্পনা হচ্ছে? অথবা পরিষ্কার ভাষায় বললে আবার কি আরও একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে? সেই অনুভবের আঁচ পাওয়া গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্মস্টাডি বিভাগের দু’ই অধ্যাপক যথাক্রমে ডঃ মধুজা মুখার্জি এবং ডঃ মানস ঘোষের স্বাক্ষর সম্বলিত অনুষ্ঠান সূচীতে। সেখানে লেখা হয়েছে।

‘’The seventieth year of Partion of India has prompted a series of meditation on the event in the form of seminars and publication. We intend to join that effort in our modest way. This two-day seminar will bring together historians, cultural theorists, literary critics and film scholars with the hope of developing a critical perspective on that watershed event, which will synthesize experiential history and history of representation. Beside Punjab and Bengal, the seminar will seek to address the usually neglected experience of North-Eastern India.

Partition is present with us in a real sence, continuing to shape destinies in subtle and not so subtle ways. And the body of representation-memoirs, reports, scholarly history, films and novels-continues to evolve and take on new forms. The seminar will continue the project of writing the history of Partition (what happened?) while reflection on its re-membering, its new assemblages (how it remains with us). In the process, we shall have the occasion to think about forgetting too-about what passes into oblivion from time to time. We hope this will also help us understand the return of divisive forces and contests over identity that we witness today.’’   

অনুষ্ঠানসূচী পড়েই এদিনের সভার মূল বিষয় উপলব্ধি করতে পারি। অধ্যাপক সুচেতা মহাজন (Professor, Centre for Historical Studies, School of Social Sciences, Jawaharlal Nehru University. New Delhi.)  উত্তর স্বাধীনতা ভারতের সময়কাল (Post Independence Transitions and Trajectories) এবং বে আব্রু পথ বিষয়ে বলেন, ‘’আমার শৈশব কেটেছে উদ্বাস্তু শিবিরে। ভারতের ৭০তম স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণ করি। আমদের দেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসে আশিষ নন্দী খুব ভালো কথা বলেছিলেন। আইডেন্টিটি, জেন্ডার এবং গণতন্ত্র এই বিষয়গুলি আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ধরে রাখার কাজ আমাদের করে যেতে হবে। ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল। গান্ধীজীর মৃত্যুর পরে কংগ্রেস দুর্বল হয়। জওহরলাল নেহরু চেষ্টা করেছিলেন নিজের দল এবং ভারত নামক দেশকে সামলে রাখতে। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল জাতীয়তাবাদী সিভিল সার্ভেন্টদের। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে (আইসিএস) জাতীয়তাবাদ কতটা ছিল? হ্যা ছিল বেশিরভাগ সিভিল সার্ভেন্ট জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করেন বিশেষত ১৯৩০ সালের পরে।‘’

অধ্যাপক সুজাতা মহাজন এরপরেই প্রাক স্বাধীনতা কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘’১৯৪৬ সালের পরে কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দ্বন্দ শুরু হয়। বিশেষত সামাজিক নীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে। নতুন করে দলীয় নীতির পর্যালোচনা হয়। কোন ধারাকে কংগ্রেস এগিয়ে নিয়ে যাবে? বিশেষত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই জন্য দ্বিখণ্ডিত দেশকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়। পণ্ডিত নেহরু, সর্দার প্যাটেল সহ কংগ্রেসের আরও বিভিন্ন শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটা রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করেন। সেদিনের সেটাই ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের নীতি। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে ভারত আর যেন ভাগ না হয়। উদ্বাস্তু জীবনের অন্ধকার কৃষ্ণপক্ষ বাংলা, পঞ্জাব সহ দেশের আপামর নাগরিক চেনে। পরিবার পরম্পরায় আমাদের দেহে মনে লেপ্টে আছে। আমরা নতুন করে আর ভাগ চাই না।‘’

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিল্ম স্টাডিজ’ বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সেদিনের বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন উদ্বাস্তু জীবনের ‘ট্রমা’। চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ ছবির ক্লিপিংস দেখিয়ে অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় তাঁর ছাত্রদের বোঝান, একটা দেশ ভাগ হওয়ার পর সেই দেশের শিকড় ছেঁড়া নাগরিক কতটা অসহায় হয়ে পড়েন। নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা, সংগীত, সভ্যতা সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যায়। বাস্তুহীন একদল মানুষ ছুটতে থাকে। খুঁজতে থাকে নিজের চেনা গাছ, চেনা পাখি, চেনা নদী, চেনা গ্রাম-গঞ্জ, চেনা সীমানাহীন আকাশ। খুঁজে না পেয়ে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে বিচ্ছিন্ন মানবতা।

সঞ্জয়বাবু বলেন, ‘’১৯৬১ সালে ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটি সম্পূর্ণ করেন ঋত্বিক ঘটক। মাত্র দু’টো কি তিনটে প্রদর্শনের পরেই ছবির প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ‘কোমল গান্ধার’ এবং ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবি দু’টি ব্যক্তি ঋত্বিক ঘটকের আত্মজীবনী। ঋত্বিক ‘কোমল গান্ধার’ ছবি করার সময় রবীন্দ্রনাথের ‘শকুন্তলা’ নামক একটি লেখার উপর নির্ভর করেছিলেন। এবং কবি কালীদাসের ‘অভিঞ্জান-শকুন্তলম’-এর প্রভাব এই ছবিতে লক্ষ করা যায়। যেটা সংলাপেও আছে। দেশভাগ যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে সেটা আমরা ঋত্বিক ঘটকের ছবি থেকে অনুভব করতে পারি।‘’

১৯ মার্চ কলকাতায় গোর্কি সদন প্রেক্ষাগৃহে আকুরা কুরোসাওয়ারের ‘দ্য লোয়ার ডেপথ’ (১৯৫৭) ছবিটি দেখলাম। ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে মানব জীবনের সমস্ত ঘাত প্রতিঘাত, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, চিন্তা ভাবনা, সামাজিক আলোচনা যেমন পাওয়া যায়। ম্যাক্সিম গোর্কির গল্প থেকে তৈরি কুরোসোয়ার এই ছবিতে সেই আলাপ আমরা দেখি। শেষ দৃশ্যে এক সহ নাগরিক একজনকে বলছে ‘বাস্টার্ড’। এটাই জীবনের বাস্তব। এটাই সমাজ জীবনের ছবি। এটাই ভাঙনের গল্প সম্ভবত।

বর্তমান সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী একটি ছবি আমাদের উপহার দিয়েছেন। ভারত-বাংলাদেশের আত্মজাদের নিয়ে কাব্যিক এই গল্পে নস্টালজিয়া ফিরে আসে। সঙ্গীতধর্মী ‘বিসর্জন’ নামের ছবিটি বারে বারে ‘বাঙাল’ জীবনের পূর্ববঙ্গে আমদের টেনে নিয়ে যায়। জীবন যে থেমে থাকে না। সেই গল্প কৌশিক আমাদের শুনিয়েছেন ঋত্বিক পরবর্তী শতাব্দীতে।

২২ মার্চ আলোচনার শেষ বক্তা ছিলেন অধ্যাপক শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত। তিনি দেশভাগের পরে মহিলাদের উপর কি প্রভাব পরে সেই বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। ওইদিন অন্যান্য যারা বক্তব্য রাখেন তাঁরা হলেন,  নিউ দিল্লীর ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ’-এর অধ্যাপক রবী বাসুদেবন, তিনি বলেন (Configuration of Partition: Exploring the Documentary and Newsreel Archive for south Asia) বিষয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডঃ সুদেষ্ণা ব্যানার্জি। তাঁর বিষয় ছিল, ( (Re) claiming the no-man’s land for the awaam: Bajrangi Bhaijaan ) অনুষ্ঠানের প্রথম বক্তা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রদীপ কুমার ঘোষ। প্রদীপবাবু তাঁর প্রারম্ভিক বক্তব্যে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন আমরা আর দেশভাগ চাই না। তিনি বলেন, ‘’উত্তর-পূর্ব ভারতে যে ধরণের আন্দোলন হচ্ছে সেটাতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল দিক রয়েছে। যে বিষয়টা অধ্যাপক মধুজা মুখোপাধ্যায় বলেছেন। সেই সব ছাত্র-ছাত্রী তাঁদের মেধা নিয়ে এগিয়ে আসবে।‘’

২৩ মার্চ আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। অনুষ্ঠানের অন্যতম ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ডঃ মধুজা মুখোপাধ্যায় একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যের কিছুটা অংশ আমাকে বললেন। তাঁর বিষয় ছিল (Train to Sealdah: Walking the Thoroughfare of History)।  তিনি বলেন, ‘’আমি সেদিন বেছে নিয়েছিলাম ইতিহাসের পাতা থেকে কলকাতার বৌ বাজার অঞ্চলের একটি উদ্বাস্তু পরিবারের গল্প। এটি ব্যক্তিগত অভিঞ্জতা। একটা রাস্তাকে ধরে এই গল্প। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে এই গল্পের শুরু। তৎকালীন হ্যারিসন রোড থেকে দাঙ্গা শুরু হয়। শিয়ালদহ উদ্বাস্তু শিবিরে যারা থেকেছেন তাঁদের গল্প। শিয়ালদহ, বৌ বাজার, কলেজ স্ট্রীট এই তিনটে রাস্তাকে কেন্দ্র করে সামাজিক অস্থিরতা ছিল আমার মূল বিষয়। সেই দেশভাগের সময় মানুষ কি মূল্য দিয়েছেন সেই বিষয়ে বলেছি। আমরা আর আমাদের দেশের নতুন করে ভাগ চাই না।‘’

আমি মনে মনে বলছিলাম আমার বাবা বসন্ত চৌধুরী আমার মা, দু’ই দাদা এবং দিদিদের নিয়ে শিয়ালদহ সহ একাধিক উদ্বাস্তু কলোনিতে থেকেছেন। সেইসব দিনের গল্প আমার স্মৃতিতে রয়েছে। আমিও দেশভাগ আর চাই না। মননশীল মানুষ চাই। উদার গণতন্ত্র চাই।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

‘তোমাদের টার্গেট যদি হয় বাংলা, বাংলার টার্গেট লালকেল্লা’

কথাটা এখন ট্রেনে বাসে আলোচনা হচ্ছে। উনি কি ফেডারেল ফ্রন্টের কথা বলছেন? উনি কি তৃতীয় ফ্রন্টের কথা বলছেন? কার কথা কেন বলছেন এটা আমরা সবাই জানি। কিন্ত আমি প্রশ্ন তুলতে চাইছি তৃণমূলনেত্রী অরাজনৈতিক একটা মঞ্চকে দ্বিতিয়াবারের জন্য বেছে নিলেন কেন? ৮ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ওইদিন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য মহিলা কংগ্রেস আয়োজিত সম্মেলনের জনসভায় আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। ধর্মতলায় গাঁধীমূর্তির পাদদেশে এইসভা ছিল। সাতবছর পর তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও জনসভায় থাকার সুযোগ হল। আমন্ত্রণ ছিল এই জনসভায় হাজির থাকার জন্য। সংবাদ মাধ্যমে সেদিনের বলা তৃণমূলনেত্রীর কিছু কথা প্রকাশ হয়েছে। খুব সম্ভবত সেদিনের বলা সবকথা সংবাদ মাধ্যম লিখতে পারেনি। মমতা ৮ মার্চ  আন্তর্জাতিক নারীদিবসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মহিলাদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে সরাসরি চলে যান সিপিএম এবং বিজেপির রাজনীতিতে। তিনি বলেন, ‘’আমি জানি সিপিএম কেন আত্মসমর্পণ করল। আমি ত্রিপুরার কথা বলছি।  সিপিএমের পাঁচটা লোক গ্রেফতার হলে হত। কিন্তু কেন আত্মসমর্পণ করলেন? যত আত্মসমর্পণ করবেন বিলীন হয়ে যাবেন আপনারা।‘’

তৃণমূলনেত্রী সেদিনের জনসভায় আরও বলেন,  ‘’আমি জানি কেন্দ্র কোন কোন এজেন্সিকে কাজে লাগিয়েছে। এতে ভয় পাওয়ার কি আছে? আমাদের রাজ্যেও এটা করা হচ্ছে। আমরা ভয় পাচ্ছি না। সিপিএম কেন ভয় পাচ্ছে? আপনারা কেন ভয় পাচ্ছেন? ত্রিপুরায় বিজেপি এসেছে। এসেছে ঠিক আছে। তোমরা কাজ কর। বাংলার কথা ভেবনা। তোমাদের টার্গেট বাংলা আমাদের টার্গেট দিল্লি।‘’

তৃণমূলনেত্রী ওইদিনের জনসভায় ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে আগাম স্লোগান বেঁধে দিলেন। বললেন, ‘’আমাদের ঘরে ঘরে মেয়েরা উন্নয়নের দায়িত্ব নিচ্ছে। আমরা সমস্ত আঞ্চলিকদল লড়াই করব। খালি হিন্দু-মুসলিম করলে দেশ চলবে না। মহিলারা দিচ্ছে ডাক বিজেপি বিদায় নিক। ২০১৯ বিজেপি হবে ফিনিশ।‘’

আমি ওইদিনের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য তথা সাংসদ মহম্মদ সেলিমকে ফোন করেছিলাম। তিনি সম্মেলনকক্ষে ব্যস্ত ছিলেন তবু ফোনটা ধরলেন। বললেন, ‘’বিজেপির বিরুদ্ধে যখন একের বিরুদ্ধে এক লড়াইয়ে এগনো হচ্ছে, তখন মমতা তৃতীয়ফ্রন্ট গঠনের কথা বলে বিজেপির হাতই শক্ত করছেন কিনা ভেবে দেখ।‘’

পরে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘’মুখে উনি যাই বলুন, তৃণমূলের কথায় আর কাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বরং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল যা করছে, তাতে বিজেপি বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে।‘’

কমরেড সেলিমদা আরও জানান, ‘’এই কথায় রাজনৈতিক চাল নেইতো? আমাদের কথা তৃণমূলনেত্রী বলে দিচ্ছেন? কেন? আগামীদিনে বাম ভোটাররা জোড়াফুলে ছাপ দিতে পারেন। আমরা সতর্ক আছি।‘’ মহম্মদ সেলিমের আমাকে বলা কথার প্রসঙ্গে তৃণমূলের এক শীর্ষনেতার কাছে কারণটা জানতে চেয়েছিলাম। মহিলা সমাবেশের দিন মঞ্চের নীচে একাধিক শীর্ষনেতা বসে ছিলেন। সুব্রত বক্সি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ইন্দ্রনীল সেন, ফিরহাদ হাকিম। সেদিন মমতা বলেন, আমাদের একঝাঁক শীর্ষনেতা মঞ্চের নীচ বসে আছেন। মহিলা সমাবেশের মঞ্চে তাঁরা আসবেন না। তাঁরা নাকি আমাদের পাহারা দিচ্ছেন। আমি সবাইকে বলছি মঞ্চে আসতে। এঁদের একজনের সঙ্গে গতকাল শনিবার আমার ফোনে কথা হয়। নাম প্রকাশ করব না এই শর্তে তিনি বলেন, ‘’ত্রিপুরায় বামফ্রন্টের হারের পরে বামপন্থীদের মনোবল প্রায় তলানিতে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সিপিএমের ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে চলে যেতে পারে। তাই হয়ত দিদি সিপিএমকে বাচানোর চেষ্টা করছেন। সিপিএমের এই টালমাটাল সময়ে সিপিএমের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন আমাদের নেত্রী। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় নবান্নের ‘ফিসফ্রাই কূটনীতি’-র কথা। সেদিন তৃণমূলনেত্রী যদি সঠিক ছিলেন তবে আজকের বাস্তবতায় নয় কেন? সিপিএমের কি এখন ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থা? গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু স্থায়ী শত্রু বলে কি কিছু হয়? তাহলে আমাদের দলে যে সব নেতা একসময় নেত্রীর বিরোধিতা করেছিল তাঁরা কি তৃণমূলে আসতে পারতেন না থাকতে পারতেন? তাঁরা স্বসম্মানে আছেন। আপনি নিজেও রাজনৈতিক দাবার বোড়ে হননি। সেইজন্য আপনি সবটাই জানেন। সৎ সাংবাদিকতার জন্য অনেক মূল্য আপনি দিয়েছেন।‘’ ভদ্রলোক আমাকে তুমি বলে এতদিন সম্বোধন করে এসেছেন। কাল আপনি কেন বললেন জানি না।

উল্লেখ্য তৃণমূল শীর্ষনেতার কথা শুনে মনে পড়ল, ত্রিপুরায় মন্ত্রীসভার শপথের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের হাত ধরে বললেন, ত্রিপুরায় সম্পূর্ণ আনকোরা কিছু তরুণ সরকার চালানোর দায়িত্ব পেয়েছেন।  রাজ্যে সরকারকে সঠিকভাবে চালাতে গেলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। শপথ গ্রহণ মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার সময় ভারতের বর্তমান সময়ের সব থেকে আলোচিত, বিতর্কিত সংসদীয় ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদী দিল্লি আসার আহ্বান জানালেন সিপিএম নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের প্রতি। তিনি বললেন, ‘দিল্লি আসুন কথা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গণতান্ত্রিক এবং ভারতীয় সংসদীয়  সৌজন্যের পরেই ত্রিপুরার তরুণ বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব পূর্বসুরীর দেখানো সৌজন্য মেনেই মানিক সরকারের পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলেন। এবং আশীর্বাদ নিলেন।

আমরা বুঝে যাই রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে যেটার খুব বেশি প্রয়োজন। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রি, ইন্দিরা গাঁধি, রাজীব গাঁধি, অটলবিহারী বাজপেয়ী, ডঃ মনমোহন সিংহ সকলেই ভারতীয় সেই সংসদীয় রীতিনীতীর কথা বলে গিয়েছেন। যে নীতি আজ প্রোথিত হয়েছে গভীর শিকড়ে। এবং  ওইসব প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছেন ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিফলিত করতে। যদিও বিরোধীরা অভিযোগ করে থাকেন নরেন্দ্র মোদী নিজের দলের কারোর সঙ্গে কথা বলেন না। সেখানে বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি? কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গাঁধি সরাসরি আক্রমণ করে বলছেন, ‘স্যুটবুটে’-র সরকারের প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় রীতিনীতি মানলে দেশের বিতর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে মুখ খুলতেন। চুপ করে থাকতেন না। ডোকলাম সীমান্ত সমস্যা হোক বা ফ্রান্সের সঙ্গে র‍্যাফেলচুক্তি। কোনও বিষয়েই আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলেন না।‘’

ত্রিপুরার শপথমঞ্চ থেকে নেমে আসার পরে সিপিএম দলের অন্যতম সফল নেতা। সফল মুখ্যমন্ত্রী বর্তমানে প্রাক্তন। মানিকবাবু স্বভাবজাত অভ্যাসে বলেছেন, ‘’উনি বললেন ভালো ভালো কথা। কাজে কি হয় দেখা যাক! সরাসরি হিংসা বন্ধের ডাক ওই মঞ্চ থেকে এলে ভালো হত। আমরাও সংসদীয় গণতন্ত্র মেনেই রাজনীতি করি।‘’

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও ত্রিপুরায় শপথের দিনে দলের অসহিষ্ণু কর্মী সমর্থদের বার্তা দিতে চেয়েছেন। ভোট শেষ রাজনৈতিক শত্রুতাও শেষ। কিন্তু এটা কি হয়? হয়ে থাকে? উপরের স্তরে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঠিকঠাক পর্যায়ে রেখে কূটনৈতিক শব্দবাক্যের ‘মিউজিক্যাল’ তাল লয় ছন্দ আমরা জানি। খেসারত দিতে হয়। নীচের তলার কর্মীদের। খুব সম্ভবত সেই কথাটা ভেবেই তৃণমূলনেত্রী ত্রিপুরা বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের আগেই সিপিএমের উদ্দেশ্যে বিধানসভায় বলেছিলেন, ‘’আপনারা জিতলে খুশি হতাম।‘’

আমরা শিরোনামে যে লাইনটা ব্যবহার করেছি তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৮ মার্চের সভার আগে চলতি মাসের পুরুলিয়ার একটি জনসভায় আরও আক্রমণাত্বক ভাষায় লালকেল্লায় যাওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি বিজেপির উদ্দেশ্যে বলেন, ‘’তোমাদের টার্গেট যদি হয় বাংলা, বাংলার টার্গেট লালকেল্লা। বাংলা নিজে বসবে না। অন্যকে বসাবে। এটা বাংলার সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য।‘’

প্রায় দেড় বছর বাকি আছে লোকসভা ভোটের। কিন্তু পরবর্তী সাধারন নির্বাচনের দামামা ইতিমধ্যেই বাজতে শুরু করেছে। ৮ মার্চ নারী দিবসের মঞ্চে মমতা দাবি করেন বিজেপিকে বধ করতে প্রয়োজন তৃতীয় ফ্রন্টের। তিনি বলেন সব আঞ্চলিক দল সঙ্ঘবদ্ধ হব। সকলে একসঙ্গে লড়াই করব। অন্যায়ের প্রতিবাদ করব। আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে একছাতার তলায় আসতে সিপিএমকে সঙ্গে নিতেও তার আপত্তি নেই। সেই কথাও সেদিন তিনি কৌশলী ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার সহ যেসব রাজ্যে কংগ্রেস শক্তিশালী সেইসব রাজ্যে বিজেপিকে হারানো সহজ হবে না। তাই মমতার চাইছেন ওড়িশার বিজু জনতা দল, তামিলনাড়ুতে ডিমকে, তেলেঙ্গনায় তেলঙ্গনা রাষ্ট্রীয় সমিতি, অন্ধ্রপ্রদেশে তেলেগু দেশমের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। তা হলে বিজেপি অনেকটা ধাক্কা খাবে। তৃণমূল সূত্রের খবর বহজন সমাজ পার্টি, সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা, এনসিপি সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন নেত্রী। সেদিনের নারী দিবসের জনসভায় পুনরায় মমতা বলেন, ‘’তৃণমূল আত্মসমর্পণ করবে না। বাংলা নেতৃত্ব দিয়ে পিছনে থাকবে। বিজেপি তোমাদের বিসর্জন দেব।‘’

গত কয়েকদিনের বিভিন্ন জনসভায় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয় ফ্রন্টের কথা বললেও কংগ্রেসের নাম উচ্চারণ করেননি। কিন্তু লক্ষ করার মত বিষয় পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যসভা ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী অভিষেক মনু সিঙঘভিকে সমর্থন করার দিনেই তৃণমূলকে জোটবার্তা দিয়েছেন কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সনিয়া গাঁন্ধি। জোট গড়ে উঠার প্রাক্কালে সনিয়া এদিন বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে বিজেপি-বিরোধী দলগুলিকে একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছেন। কংগ্রেস এবং তৃণমূল দু’ই দলের দু’ই নেত্রীর সম্পর্কের ব্যাকারণটা আমরা সবাই জানি। ৯ মার্চ মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে সনিয়া বলেন, ‘’সব দলের একসঙ্গে আসা কঠিন। কারন, নীচের স্তরে একে অন্যের প্রতিপক্ষ। পশ্চিমবঙ্গ-সহ অনেক রাজ্যে এই পরিস্থিতি। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে মতপার্থক্যকে রাজ্যে রেখেই একসঙ্গে আসা দরকার।‘’

কংগ্রেস সূত্রে খবর আগামি সপ্তাহেই বিজেপি-বিরোধী দলগুলিকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সনিয়া গাঁন্ধি। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। কংগ্রেসের আশা ওইদিনের নৈশভোজে ভারতের সর্বজনীন ‘দিদি’ থাকবেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবেই থাকবেন। সেই সভায় সিপিএম নেতৃত্ব থাকলেও তিনি সংসদীয় এবং গণতান্ত্রিক ধারাপাত মেনেই আলোচনায় অংশ নেবেন। এই নিবন্ধ লেখার সময় আমার একটি লেখার কথা মনে হল। সম্প্রতি একটি বই পড়ছি। নেপাল মজুমদারের লেখা ‘ভারতের জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ’। জানি না পুরো বইটা পড়তে পারব কিনা। বিভিন্ন সামাজিক কারণে বাড়িতে বেশিক্ষণ লেখাপড়ার কাজ করাটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক। গত কয়েক বছরে যে অভিঞ্জতা হয়েছে এটা ভবিষ্যতে আর কারও যেন না হয়।

নেপাল মজুমদার লিখছেন, ‘’লক্ষৌ কংগ্রেসের (এপ্রিল ১৯৩৬) অনতিকাল পরেই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য জওহরলালের উদ্যোগে যে ‘All India Civil Liberties Union’ গঠিত হয়, কবি তাহার অনারারি প্রেসিডেন্টরূপে এই আন্দোলনের প্রায় ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই আন্দোলনে কবির অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন ঞ্জাপন করিয়া রোমা রোলাঁ এক পত্রে কবিকে লিখিয়াছিলেন (৫ই ডিসেম্বর, ১৯৩৭)

‘’In the Bulletin of the ‘Indian Civil Liberties Union’, which I receive from time to time, I read your great name always in the frontline of the sacred struggle for the defense of liberty and for justice.

You know that in the West I take part in the same battles, which are still more desperate: for the circle of enemies is fiercer and draws closer every day. But the awakening (social, moral and intellectual) of the workers and peasants of France is a joy and a great hope for me.

Especially since that last two or three years, they have become conscious of their unity and strength, as well as their duty towards guides like Jaures and a great poet like Victor Hugo- or like yourself. They deserve it” [Rolland And Tagore: P-71-72]    

 

 

Leave a comment

Filed under Uncategorized