ক্যামেরার চোখে গ্রাম সংসদ

টানটান উত্তেজনার মধ্যে অবশেষে রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোটের দিন আমরা পেলাম। ১৪ মে একদিনের ভোট নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। রণক্ষেত্র তৈরি করতে সরকার এবং বিরোধী দলগুলি আইনি যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। এটাই দস্তুর বা স্বাভাবিক। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্র। পঞ্চায়েত নির্বাচনে সময় কিনতে বিরোধী দলগুলি আদালতের কাছে আবেদন জানায়। আলোচ্য পঞ্চায়েত নির্বাচন আদালত পর্যন্ত গড়ানোর আগে নির্বাচন কমিশন ১, ৩ ও ৫ মে তিন দফায় ভোট গ্রহণের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছিল। দীর্ঘ সময় আইনি টানাপড়েনে কেটে যাওয়ার পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোট গ্রহণ একদিনে এসে দাঁড়াল। নির্বাচন কমিশন ভোট গণনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সঠিকভাবেই বলেছিলেন, ‘’আমরা খুব খুশি। গণতন্ত্র অনুযায়ী অন্তত নির্বাচনটা হোক। আমরা চাই, শান্তিপূর্ণ ভাবে, সুন্দর ভাবে ভোটের কাজ সম্পন্ন হোক।‘’

এবছরের পঞ্চায়েত ভোটের দিন ঘোষণার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বচ্চো আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ই-মনোনিয়ন বিষয়ক কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে ‘ব্যাড অর্ডার’ বলে মন্তব্য করেছে। সংবাদ মাধ্যম লিখছে, ‘’পঞ্চায়েত ভোটে ই- মনোনয়নকে বৈধতা দিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল বৃহস্পতিবার তার উপর স্থগিতাদেশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। ফলে ১৪ মে ভোট হতে আর বাঁধা থাকল না। এ দিন হাইকোর্টের রায়কে ‘ব্যাড অর্ডার’ বলে মন্তব্য করেছেন শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু একই সঙ্গে ৩৪% আসনে ভোট ছাড়াই প্রার্থীদের জিতে যাওয়ার ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে রাজ্য নির্বাচনকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, আদালতের অনুমতি ছাড়া ওই সব আসনের ফল ঘোষণা করে সরকারি বিঞ্জপ্তি করা যাবে না। আগামী ৩ জুলাই এ বিষয়ে ফের শুনানি হবে।‘’ (সূত্র- আঃ বাঃ পঃ, ১১মে, ২০১৮)

ই-মনোনয়ন বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রার্থী অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার নোদাখালি থানায় অভিযোগ জানিয়েছে সিপিএম। ৯ মে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘’ই-মনোনয়ন কারা দিয়েছেন, সেই নামধাম জমা ছিল কমিশনের কাছে। জমা দেওয়া হয়েছিল আদালতেও। সে সব প্রার্থীর তথ্য বাইরে বেরোতেই হুমকি শুরু হয়েছে।‘’

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভার সদস্য এবং জেলায় দলের তরফে ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত শুভাশিস চক্রবর্তী বলছেন, ‘’ই-মনোনয়ন কারা দিয়েছেন, তা জানার সুযোগ নেই এবং আমরা জানিও না। সন্ত্রাসের ভুয়ো অভিযোগের মতো ওটাও ভিত্তিহীন।‘’

শুধুমাত্র পঞ্চায়েত নির্বাচন নয়, বিধাসভা বা লোকসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণার পর সরকার এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে একটি আইনি লড়াই শুরু হয়ে যায়। আমাদের ঞ্জান হওয়ার পর থেকে আমরা এটাই দেখে আসছি। ১৯৭৮ সালের নব পর্যায়ের ত্রিস্ত্রর পঞ্চায়েত (গ্রাম সংসদ) পশ্চিমবঙ্গে আসার পর থেকে বাংলার গ্রামের শাসন ক্ষমতা কাদের হাতে থাকবে? এই প্রশ্নে সচেতন মোড়ল, ক্ষমতাচ্যুত জোতদার, শিক্ষিত বাম রাজনীতির শিক্ষক, অশিক্ষিত বর্গাদার নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করে। শাসন ক্ষমতা হারানো ‘ইউনিয়ন বোর্ড’-এর চতুর গ্রাম প্রধান তথা সামন্তপ্রভুর দল ধীর ছন্দে বামফ্রন্টভুক্ত দলগুলিতে আশ্রয় নিতে থাকে। কারণ ওই সব স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাদী চতুর সামন্তশ্রেণী আগেই বুঝে গিয়েছিল আধুনিক পঞ্চায়েত হবে ক্ষমতা এবং অর্থের কেন্দ্র। সিপিএম তথা বামফ্রন্ট আধুনিক ‘গ্রাম পঞ্চায়েত’-এর রুপকার হিসাবে যে দাবি করে সেটা তাত্ত্বিকভাবে কতটা সঠিক সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ লেনিনের রাশিয়ায় যেমন আধুনিক গ্রাম পঞ্চায়েতের মডেলের কথা আমরা জানি। পাশাপাশি কংগ্রেস নেতা তথা ভারত নামক  আধুনিক গণতন্ত্রের রুপকার তথা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর ‘দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে ভারতের গ্রামপঞ্চায়েত তথা দেশের শাসন ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ সেই বিষয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন। শাসন ব্যাবস্থা বিষয়ক আলোনায় পণ্ডিত নেহরু তাঁর বইয়ে বেছে নিয়েছিলেন চন্দ্রগুপ্ত এবং চাণক্যকে (কৌটিল্য)। কৌটিল্যের সঙ্গে  চন্দ্রগুপ্তের পরস্পরের সম্পর্কের বিষয়কে। তিনি লিখছেন,

‘’There was hardly anything Chanakya would have refrained from doing to achieve his purpose; he was unscrupulous enough; yet he was also wise enough to know that this very purpose might be defeated by means unsuited to the end. Long before Clausevvitz, he is reported to have said that war is only a continuance of state policy by other means. But, he adds, war must always serve the larger ends of policy and not become an end in itself; the statesman’s objective must always be the betterment of the state as a result of war, not the mere defeat and destruction of the enemy. If war involves both parties in a common ruin, that is the bankruptcy of statesmanship. War must be conducted by armed forces; but much more important than the force of arms is the high strategy which saps the enemy’s morale and disrupts his forces and brings about his collapse, or takes him to the verge of collapse, before armed attack. Unscrupulous and rigid as Chanakya was in the pursuit of his aim, he never forgot that it was better to win over an intelligent and high-minded enemy than to crush him. His final victory was obtained by sowing discord in the enemy’s ranks, and, in the very moment of this victory, so the story goes, he induced Chandragupta to be generous to his rival chief. Chanakya himself is said to have handed over the insignia of his own high office to the minister of that rival, whose intelligence and loyalty to his old chief had impressed him greatly. So the story ends not in the bitterness of defeat and humiliation, but in reconciliation and in laying the firm and enduring foundations of a state, which had not only defeated but won over its chief enemy.’’ Chapter 4: The Discovery of India, Chandragupta and Chanakya: The Maurya Empire Established (Pages 122-124)

 

যদিও আধুনিক সমাজবিঞ্জানীরা বলে থাকেন ভারতে আধুনিক গ্রামপঞ্চায়েত ত্রিস্তরে ভাগ করে একটি গনতান্ত্রিক ‘গ্রামসংসদ’-এর উচ্চতায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই বামফ্রন্ট সরকারের। আমার মনে পড়ছে ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্বে প্রথম ত্রিস্তর গ্রামপঞ্চায়েত নির্বাচন। নকশালপন্থী আদর্শবাদী নেতৃত্ব জেল থেকে বেরিয়ে আসছেন। সেই বছর বামফ্রন্ট সরকার মাত্র এক বছর ক্ষমতায় এসেছে। রাজ্যে কংগ্রেসের দাপুটে নেতার দল বিভ্রান্ত। আত্মগরিমা ভেঙে পড়ছে। রাগে ক্ষোভে ফুটছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী স্থানীয় জোতদার শ্রেণী কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে জলমাপা শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তারা। হঠাৎ আছড়ে পড়া কালবৈশাখী ঝড়ের মত পঞ্চায়েত ভোট এসে পড়ল। শান্ত গ্রাম ধীরে ধীরে তেতে উঠল। স্থানীয় মোড়লের দল পিছিয়ে এল। ছদ্ম আভিজাত্য ভেঙে পড়ল। আমরা সদ্য যৌবনে উত্তীর্ণ যুবকের দল সন্ত্রস্ত চাউনি নিয়ে সমাজ পরিবর্তন দেখলাম। কংগ্রেসের কেউ কেউ ‘গ্রামসভা’, ‘গ্রাম সংসদ’ গড়ে তোলার নতুন প্রস্তাব নিয়েও তখন ভাবনা চিন্তা শুরু করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল নির্বাচিত গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যরা স্থানীয় সৎ তথা গ্রামের বুদ্ধিজীবী মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি করবে। যে কমিটিকে ‘গ্রামসভা’ বা ‘গ্রাম সংসদ’ বলা হবে।

উত্তর আধুনিক ভারতে পঞ্চায়েতের কাজ কেমন হতে পারে সেটা আমরা জানতে পেরেছি ৩১ বছরের ছবি রাজওয়াতের কাছে। পুণের নামী ইন্সটিটিউট থেকে মানেজমেন্ট পাশ করা কৃতি ছাত্রী তিনি। ২০১১ সালে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় চাকরির সুখ স্বাচ্ছন্দ ছেড়ে পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী হয়ে জিতে যান। জয়পুর থেকে ৬০ কিলোমটার দূরের গ্রাম ‘সোডা’ গ্রামপঞ্চায়েতের ভোটে লড়েন ছবি। এবং পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে কি কাজ করেছেন? সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর, পরিচ্ছন্ন ৯০০ বাড়ি, প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে পাকা শৌচালয়। ৪০টি প্রধান রাস্তাই পাকা। প্রতিটি বাড়িতে জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করেছেন ছবি রাজওয়াত। এবং সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। এক বছর আগের খবর থেকে জানা যায় একটি গ্রামের উন্নয়ন কতটা করা যায় সেটা উদাহারণ হয়ে আছে রাজস্থানের ‘সোডা’ নামক গ্রামটি। ‘স্মার্ট ভিলেজ’ বললে খুব কিছু ভুল বলা হবে কি? আদর্শ গ্রামপঞ্চায়েত বলতে সম্ভবত এই উন্নয়নকে বলতে হয়।

সেই ‘গ্রাম সংসদ’ গ্রাম পঞ্চায়েতে থাকলেও উল্লেখিত সংসদের পঞ্চায়েত চালানোর ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা থাকে? প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সাংবাদিক হিসেবে আমি ২০০৩ এবং ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট স্বক্রিয়ভাবে কভার করেছি। নিজের একলাখ টাকা দামের ক্যামেরা (Sony PC 9E’) নিয়ে একা একা কাজ করার আমার অভিঞ্জতা হয়েছিল। সেই ক্যামেরা আমার ঘরে এখনও রয়েছে। আবার সঙ্গে  অফিস ক্যামেরা এবং ক্যামেরম্যান সঙ্গে নিয়েও কাজ করেছি।  পঞ্চায়েত ভোটের এক বছর আগে থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গিয়ে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, গোষ্ঠী সংঘর্ষের খবর আমাদের করতে হয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটের এক বছর আগে থেকে সংবাদ মাধ্যম গ্রামাঞ্চলের খবর করতে শুরু করে। ২০০৩ সালে আমি ‘জি নিউজ’-এর সংবাদদাতা হিসেবে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার দায়িত্বে আসি। আজ থেকে ১৫ বছর আগে সুন্দরবন অঞ্চল এখনকার মত এতটা উন্নত ছিল না। তখন পরিকাঠামো প্রায় ছিলনা বললেই চলে।

সেই কারণে আমরা সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা কখনও কাকদ্বীপে তৃণমূল দলের পার্টী অফিসে রাত কাটাতাম। একটা চৌকির উপর একটা শতরঞ্চি। ব্যবস্থা করতেন বর্তমান রাজ্য সরকারের সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা। সাগরে থাকার ব্যবস্থা করতেন বিধায়ক বঙ্কিম হাজরা। পাথরপ্রতিমা, কুলতলি, মৈপীঠ সহ একাধিক প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিনের পর দিন থাকেতে হয়েছে। বাসন্তী, সোনাখালী, গোসাবা প্রভৃতি অঞ্চলে আমাদের ঘুরতে হয়েছে। পিয়ালি থেকে পাথর প্রতিমা। বজবজ থেকে বুড়িগঙ্গা অথবা মুড়িগঙ্গা। নামখানা-চন্দনপিঁড়ি গ্রাম (তেভাগা আন্দোলন খ্যাত)। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার এমন কোনও ব্লক নেই আমি যে ব্লকে খবর করতে যাইনি। সেইসব ব্লকের বা অঞ্চলের এসইউসি, আরএসপি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএম নেতৃত্ব আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করতেন। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার মত কোনও হোটেল ছিল না।

আমি  সেই সময়কালের একটি খবরের খসড়া এই লেখায় উল্লেখ করছি। Slug: Ramganga G.P, Date: 21/04/04, V.O.- (1) দঃ ২৪ পঃ জেলার পাথরপ্রতিমা ব্লকের সিপিআইএমের পাঁচজন সদস্য পরিচালিত গ্রাঃ পঃ-এ অনাস্থা প্রস্তাব আনল তৃণমূল এবং কংগ্রেসের ১০জন পঞ্চায়েত সদস্য।

বাইটঃ ফণীভূষণ গিরিঃ ব্লক সভাপতি, কংগ্রেস, পাথরপ্রতিমা

বাইটঃ রাধেশ্যাম পণ্ডিত, সদস্য টিএমসিপি, পাথরপ্রতিমা

V.O.- (2)- অনাস্থা প্রস্তাব আনার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা বিভিন্ন উপসমিতি গঠনের ক্ষেত্রে টাই। এবং রামগঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের সেক্রেটারিকে দুর্নীতির অভিযোগে বি ডি ও-এর শোকজ নোটিশ।

বাইটঃ কার্তিক চন্দ্র বেড়া, সেক্রেটারি, রামগঙ্গা গ্রামপঞ্চায়েত

বাইটঃ সন্তোষ দাসঃ প্রধান, সিপিআইএম, রামগঙ্গা গ্রামপঞ্চায়েত

V.O.-(3)-গত ২০০৩-০৪ আর্থিক বছরে রামগঙ্গা গ্রামপঞ্চায়েতে কোনও রকম অডিট হয়নি। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিআইএম তিনটি দলের মধ্যে রয়েছে টানটান উত্তেজনা। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ার সুবাদে যে কোনও মূহুর্তে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বেঁধে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মানুষেরা।

বাইটঃ সৌমেন হোড়, যুগ্ম সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক, পাথরপ্রতিমা।

আমার একটি লেখা নিবন্ধ ৩ নভেম্বর ২০০৩ সালে সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়। নিবন্ধটি সাগরে দুর্নীতি নিয়ে। কিছুটা কৌতুকের আশ্রয় নিয়ে লেখাটি লিখেছিলাম। বোটখালি নামক অঞ্চলের ভাঙ্গন এবং সেই ভাঙ্গনের জন্য বরাদ্দ টাকা পঞ্চায়েত সমিতিতে নিয়ে আসার জন্য লড়াইয়ের গল্প আমি লিখেছিলাম। ওই দিনের সম্পাদকীয় পাতায় ‘অতিথি লেখক’ কলমে ‘সাগরযাত্রা’ শিরোনামে লেখাটি প্রকাশ হয়েছিল। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নীতি আয়োগ সূত্রে খবর, ভারতে ১১৫টি জেলাকে পিছিয়ে পড়া এলাকা হিসেবে নীতি আয়োগ চিহ্নিত করেছে। ২০০৭ সালে ইউপিএ সরকার ২৭২টি জেলাকে পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। উন্নয়নের জন্য ওইসব জেলায় কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ করে মনমোহন সিংহের সরকার। উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। সেই প্রকল্পের নাম ছিল ‘ব্যাকওয়ার্ড রিজিওনাল গ্র্যান্ট ফান্ড’ (বিআরজিএফ)। দারিদ্র, পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই চারটি বিষয়ে পিছিয়ে থাকার মাপকাঠিতে জেলাগুলির নাম উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক ১১৫টি জেলার প্রকাশিত তালিকায় আমাদের রাজ্যের বীরভূম এবং মুরশিদাবাদের নাম রয়েছে। বাদ পড়েছে বণিকসভা অ্যাসোচেমের অনগ্রসর জেলার তালিকায় থাকা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, কোচবিহার এবং দার্জিলিং, চারটি জেলা। এই তালিকা ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আলিপুদুয়ারের কামাখ্যাগুড়ির সভায় বলেন, ‘’আরনিং হচ্ছে না শুধু বারনিং হচ্ছে। আমি তো বলতে পারি না গরিব লোককে চাল, বিনা পয়সার চিকিৎসা, স্কুলের অনুদান, শিক্ষাশ্রী, সবুজশ্রী বা কন্যাশ্রী দেব না?’’

ডিসেম্বর মাসে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানিয়েছিলেন, ১০০ শতাংশ বুথে কমিটি করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, বসিরহাটের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় সব বুথে কমিটি গড়া মুশকিল। ৯০-৯৫% বুথে কমিটি হয়ে যাবে আশা করি।‘’

তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামআঞ্চলে জোর প্রচার করছে ‘বাম-রাম’ জোট হয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, ‘’দলের মতাদর্শের বাইরে গিয়ে কোনও কর্মী বিজেপির সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত করলে তাঁদের পত্রপাঠ বহিষ্কার করা হবে।‘’

কংগ্রেসের বক্তব্য ঠিক কি? ২৫ এপ্রিল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাজ্যস্তরে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলন করতে রাজ্য কমিটির কোনও বাঁধা নেই। কিন্তু জাতীয়স্তরে কংগ্রেসের মমতাকে প্রয়োজন। কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ ২৫ এপ্রিল বলেন, ‘’মমতা একজন জনপ্রিয় নেত্রী। তার দলের নীতি ধর্মনিরপেক্ষ। আমরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

রাজ্যের ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট ‘রক্তস্নাত’ হবে না শান্তিপূর্ণ সেই আলোচনা গত কয়েক মাস থেকেই হচ্ছে। সরকারে থাকার সুবাদে তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামের উন্নয়ন করেনি এ কথা সৎ নাগরিক হিসেবে বলা যাবে না। আবার সৎ সাংবাদিক হিসেবেও বলতে হয় বাংলার গ্রামে উন্নয়ন হয়েছে। তবে কতটা? ‘স্মার্ট গ্রাম’ কি বলা যাবে? দুর্নীতি কি হচ্ছেনা? কংগ্রেস, সিপিআইএম এবং বিজেপি তাঁদের প্রচারে দুর্নীতিকে কতটা ইস্যু করতে পেরেছে? আমাদের জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৭ মে পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরনোর পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘’সবচেয়ে ভাল হল জনগণের। আমরা জনগণের পক্ষে। নির্বাচনের পক্ষে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক।‘’

Advertisements

Leave a comment

Filed under Uncategorized

এই শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-অধ্যাপকদের চিন্তা-মননে আজও ‘দেশভাগ’-এর উৎকণ্ঠা

ভারত নামক একটি বৃহৎ ভূখণ্ড যে বছর ভেঙে দু’টুকরো করা হল তখন আমার জন্ম হয়নি। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট মধ্যরাতের পরে আমি জন্মেছি। ১৯৫৮ সাল ধরলে ১১ বছর পর আমার দেশ খন্ডিত ভারতে আমার জন্ম। অবশ্যই আমার বাবা-মা বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর আমার জন্ম। তারপর উদ্বাস্তু হিসাবে তাঁদের সংগ্রামের, আবেগের গোবর লেপা আঙিনার গল্প শুনেছি। জল থৈ থৈ ডিঙি নৌকো, মোটা গাছের তৈরি ডিঙি নৌকোর বৈঠা টেনে টেনে আমার মা মাসিরা রান্না ঘর, শোবার ঘর, বৈঠকখানা ঘরে যাতায়াত করতেন। ‘ডিঙি নৌকো’ না পেলে সাঁতরে এই ঘর সেই ঘরে চলে যেতেন। এটা ছিল তাঁদের সহজাত সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের রোমান্টিকতা। তাই দেশ ভাগ তাঁদের অব্যক্ত ভাষায় প্রকাশ হত। ফেলে আসা স্মৃতি তাঁদের টেনে নিয়ে যেত। আমার এক বাঙাল বন্ধুর অধ্যাপক বাবা বলতেন, ‘দেশ ভাগ একবার হয়েছে কিন্তু বঙ্গভঙ্গ? আমাদের বাংলা  দু’বার ভাঙা হয়েছে। আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লীর দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত করা হল। লর্ড কার্জন যেমন পার্লামেন্টকে না জানিয়ে বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন, তেমনি রদ করার ব্যাপারেও পার্লামেন্টকে জানানো হয়নি।’

কল্লোলিত জলের, স্বচ্ছ জলের ঢেউয়ের শিশির-শিউলির আবেগ দেখেছি আমার বাঙাল আত্মীয়দের চোখের ভাষায়। মনের না বলা অম্লান প্রতিশব্দে। আমি নিজেও সাঁতার শিখেছি আমার মায়ের কাছে। সেই প্রশিক্ষণেই আমি সত্তর দশকে আমার মামার সঙ্গে পাটুলির গঙ্গা এপার ওপার করে সাঁতার কাটতাম। চোখে দেখেছি লক্ষ্মীর আলপনা আঁকা কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি, উঠোন-বারান্দায় লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। কলাগাছের মোটা খালি/খোল গোল করে নারকেল কাঠি দিয়ে দিয়ে আটকে দেওয়া হত। লক্ষ্মী পুজোর দিন। পাঁচটা এইরকম খোলের উপর লাল কাপড়ের শালু। লাল কাপড়ের উপর ধান, পাঁচটা কড়ি, দূর্বা, হলুদ-সিঁদুর জলে ভেজানো ধাগা। লক্ষ্মী পূজোর পর বাড়িতে ৫০-১০০ জনের পাত পড়ত। সুগন্ধি চাল, মূগ ডালের খিচুড়ি, পাঁচ মিশেলি সবজি, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, আলু, পটল, কুমড়ো, বেগুন ভাজা, ফুল কপির তরকারি, পায়েস, সন্দেশ সহযোগে। আমাদের বাড়িতে পাড়া ভেঙে পড়ত মায়ের হাতে রান্না খাওয়ার জন্য। কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই দলের বিভিন্ন দলের নেতা কর্মী আসতেন। নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা কানু সান্যাল সহ আরও অনেকে এসেছেন মায়ের হাতের রান্না খেতে। দেশভাগের এই স্মৃতি নিয়ে আমি বড় হয়েছি। এই রিচুয়াল, মূল্যবোধ, কৃষ্টি, বিয়ের গান দেখে শুনে আমি বড় হয়েছি। আমের মুকুলের গন্ধ শুকে বড় হয়েছি। কাসুন্দির ঝাঁজের তাড়া খেয়েও ছুটে গেছি ‘কাসুন্দির হাঁড়ির’ কাছে। ধব ধবে সাদা গায়ের রঙ, সাদা থান পড়া আমার দিদিমার কাছে। পিসিদের কাছে। যদিও আমি নিজে কালো মানুষের উপত্যকার বাসিন্দা। আমি নিজে আজও রাজনৈতিক এবং সামাজিক কারণে উদ্বাস্তু। আমার নিজের কোনও ঘর নেই। বাড়ি নেই। এটাই স্বাভাবিক। বাবার দেওয়া মোটা কাপড়/ খড়ের চাল দেওয়া মাটির বাড়ি কেড়ে নিলো কারা? কেড়ে নিলে সবার এই পরিস্থিতি হয়। তাই আজও উচ্চারণ করি। চিরকাল আবৃত্তি করব,  ‘ আহা! আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়ায় উঠতে দাও/ সেখানে বসে আমি মদ খাবো, তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে পড়ে;/ আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাবো, ভুলে যাবো, ভুলে যাবোঃ/আমি একজন কালো রঙের মানুষ, আমার জন্য এই সব।’ (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত নিগ্রো কবিতা থেকে।)

যত বড় হয়েছি, পশ্চিমবঙ্গে আমাদের যেখানে যত আত্মীয় আছেন সেই সব জেলায়, অঞ্চলে, জায়গায় ছুটে গিয়েছি। উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর, হাবড়া, বনগাঁ, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, নেতাজীনগর, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, মালদহ, কোচবিহার, কাটোয়া, পূর্বস্থলী, পাটুলি, ইছাপুর, গারুলিয়া, ব্যারাকপুর, খড়গপুর সহ আরও বিভিন্ন অঞ্চলে। কাসুন্দি, আম, কাঁঠাল, নারকেল, খেজুরের রস, খেজুরগুড়ের পিঠে-পায়েস এবং অবশ্যই ‘কলোনি ঘর-সংসার’ দেখতে বারে বারে ছুটে যেতাম। ‘বারোঘর এক উঠোন’ দেখতে। এই বাংলার ষাটের দশকে তখনও দগ দগ করছে উদ্বাস্তু কলোনি জীবনে ‘পূর্ববঙ্গের অভিধাত’। আমার স্মৃতি আমাকে চাবকায়। লোভ জাগে যদি একবার ছিটমহলে গিয়ে একুশ শতাব্দীর ‘উদ্বাস্তু কলোনি’ দেখি। খুব কাছে বারুইপুরে গিয়ে ‘রোহিঙ্গা কলোনি’ দেখলেও মানবযন্ত্রণার আলপনা আঁকা জীবন খুঁজে পাব। সিরিয়ার মানুষের যন্ত্রণার কথা শুনতে ইচ্ছে করে। মধ্য প্রাচ্যের যন্ত্রণা-দীর্ণ আধুনিক উদ্বাস্তু জীবনের শৈশব কৈশোরের চড়ুইভাতি দেখতে ইচ্ছে জাগে।কারণ আমি এই বাংলার রাজনৈতিক কারণে ‘ঘরছাড়া’-দের প্রত্যক্ষ করেছি। খবর করেছি। স্টোরি লাইভ করেছি। একুশ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাংলার উত্তাল রাজনীতির প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমরা যারা, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে যারা সক্রিয় সাংবাদিকতা করেছি তাঁরা ওইসব তাৎক্ষনিক ‘উদবাস্তু’দের খুব কাছ থেকে দেখেছি। বিষয়টা নিয়ে আজও সেভাবে লেখালেখি হয়নি।

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিল্ম স্টাডি’ এবং ‘নেতাজী ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ’, কলকাতা  বিভাগের উদ্যাগে দু’দিন (২২-২৩ মার্চ) ব্যাপি একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেমিনারের বিষয়সূচি ছিল, ‘Partion of India: Contemporary Perspectives, National seminar organized by Department of Film Studies, Jadavpur Univarsity and Netaji Institute for Asian Studies, Kolkata.’

বিবেকানন্দ (সুবর্ণ জয়ন্তী ভবন) সভাঘরে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। পর পর দু’দিন উপস্থিত থাকতে পারিনি। কিন্তু প্রথম দিনের বিদগ্ধ অধ্যাপক-শিক্ষক, ছাত্রদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তাঁরা উৎকণ্ঠা, উদ্বেগে রয়েছেন। পরে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানতে বুঝতে চেষ্টা করি। আবার কি খুব সন্তর্পণে আরও একটি দেশভাগের পরিকল্পনা হচ্ছে? অথবা পরিষ্কার ভাষায় বললে আবার কি আরও একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে? সেই অনুভবের আঁচ পাওয়া গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্মস্টাডি বিভাগের দু’ই অধ্যাপক যথাক্রমে ডঃ মধুজা মুখার্জি এবং ডঃ মানস ঘোষের স্বাক্ষর সম্বলিত অনুষ্ঠান সূচীতে। সেখানে লেখা হয়েছে।

‘’The seventieth year of Partion of India has prompted a series of meditation on the event in the form of seminars and publication. We intend to join that effort in our modest way. This two-day seminar will bring together historians, cultural theorists, literary critics and film scholars with the hope of developing a critical perspective on that watershed event, which will synthesize experiential history and history of representation. Beside Punjab and Bengal, the seminar will seek to address the usually neglected experience of North-Eastern India.

Partition is present with us in a real sence, continuing to shape destinies in subtle and not so subtle ways. And the body of representation-memoirs, reports, scholarly history, films and novels-continues to evolve and take on new forms. The seminar will continue the project of writing the history of Partition (what happened?) while reflection on its re-membering, its new assemblages (how it remains with us). In the process, we shall have the occasion to think about forgetting too-about what passes into oblivion from time to time. We hope this will also help us understand the return of divisive forces and contests over identity that we witness today.’’   

অনুষ্ঠানসূচী পড়েই এদিনের সভার মূল বিষয় উপলব্ধি করতে পারি। অধ্যাপক সুচেতা মহাজন (Professor, Centre for Historical Studies, School of Social Sciences, Jawaharlal Nehru University. New Delhi.)  উত্তর স্বাধীনতা ভারতের সময়কাল (Post Independence Transitions and Trajectories) এবং বে আব্রু পথ বিষয়ে বলেন, ‘’আমার শৈশব কেটেছে উদ্বাস্তু শিবিরে। ভারতের ৭০তম স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণ করি। আমদের দেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসে আশিষ নন্দী খুব ভালো কথা বলেছিলেন। আইডেন্টিটি, জেন্ডার এবং গণতন্ত্র এই বিষয়গুলি আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ধরে রাখার কাজ আমাদের করে যেতে হবে। ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল। গান্ধীজীর মৃত্যুর পরে কংগ্রেস দুর্বল হয়। জওহরলাল নেহরু চেষ্টা করেছিলেন নিজের দল এবং ভারত নামক দেশকে সামলে রাখতে। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল জাতীয়তাবাদী সিভিল সার্ভেন্টদের। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে (আইসিএস) জাতীয়তাবাদ কতটা ছিল? হ্যা ছিল বেশিরভাগ সিভিল সার্ভেন্ট জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করেন বিশেষত ১৯৩০ সালের পরে।‘’

অধ্যাপক সুজাতা মহাজন এরপরেই প্রাক স্বাধীনতা কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘’১৯৪৬ সালের পরে কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দ্বন্দ শুরু হয়। বিশেষত সামাজিক নীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে। নতুন করে দলীয় নীতির পর্যালোচনা হয়। কোন ধারাকে কংগ্রেস এগিয়ে নিয়ে যাবে? বিশেষত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই জন্য দ্বিখণ্ডিত দেশকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়। পণ্ডিত নেহরু, সর্দার প্যাটেল সহ কংগ্রেসের আরও বিভিন্ন শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটা রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করেন। সেদিনের সেটাই ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের নীতি। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে ভারত আর যেন ভাগ না হয়। উদ্বাস্তু জীবনের অন্ধকার কৃষ্ণপক্ষ বাংলা, পঞ্জাব সহ দেশের আপামর নাগরিক চেনে। পরিবার পরম্পরায় আমাদের দেহে মনে লেপ্টে আছে। আমরা নতুন করে আর ভাগ চাই না।‘’

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিল্ম স্টাডিজ’ বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সেদিনের বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন উদ্বাস্তু জীবনের ‘ট্রমা’। চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ ছবির ক্লিপিংস দেখিয়ে অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় তাঁর ছাত্রদের বোঝান, একটা দেশ ভাগ হওয়ার পর সেই দেশের শিকড় ছেঁড়া নাগরিক কতটা অসহায় হয়ে পড়েন। নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা, সংগীত, সভ্যতা সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যায়। বাস্তুহীন একদল মানুষ ছুটতে থাকে। খুঁজতে থাকে নিজের চেনা গাছ, চেনা পাখি, চেনা নদী, চেনা গ্রাম-গঞ্জ, চেনা সীমানাহীন আকাশ। খুঁজে না পেয়ে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে বিচ্ছিন্ন মানবতা।

সঞ্জয়বাবু বলেন, ‘’১৯৬১ সালে ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটি সম্পূর্ণ করেন ঋত্বিক ঘটক। মাত্র দু’টো কি তিনটে প্রদর্শনের পরেই ছবির প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ‘কোমল গান্ধার’ এবং ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবি দু’টি ব্যক্তি ঋত্বিক ঘটকের আত্মজীবনী। ঋত্বিক ‘কোমল গান্ধার’ ছবি করার সময় রবীন্দ্রনাথের ‘শকুন্তলা’ নামক একটি লেখার উপর নির্ভর করেছিলেন। এবং কবি কালীদাসের ‘অভিঞ্জান-শকুন্তলম’-এর প্রভাব এই ছবিতে লক্ষ করা যায়। যেটা সংলাপেও আছে। দেশভাগ যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে সেটা আমরা ঋত্বিক ঘটকের ছবি থেকে অনুভব করতে পারি।‘’

১৯ মার্চ কলকাতায় গোর্কি সদন প্রেক্ষাগৃহে আকুরা কুরোসাওয়ারের ‘দ্য লোয়ার ডেপথ’ (১৯৫৭) ছবিটি দেখলাম। ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে মানব জীবনের সমস্ত ঘাত প্রতিঘাত, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, চিন্তা ভাবনা, সামাজিক আলোচনা যেমন পাওয়া যায়। ম্যাক্সিম গোর্কির গল্প থেকে তৈরি কুরোসোয়ার এই ছবিতে সেই আলাপ আমরা দেখি। শেষ দৃশ্যে এক সহ নাগরিক একজনকে বলছে ‘বাস্টার্ড’। এটাই জীবনের বাস্তব। এটাই সমাজ জীবনের ছবি। এটাই ভাঙনের গল্প সম্ভবত।

বর্তমান সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী একটি ছবি আমাদের উপহার দিয়েছেন। ভারত-বাংলাদেশের আত্মজাদের নিয়ে কাব্যিক এই গল্পে নস্টালজিয়া ফিরে আসে। সঙ্গীতধর্মী ‘বিসর্জন’ নামের ছবিটি বারে বারে ‘বাঙাল’ জীবনের পূর্ববঙ্গে আমদের টেনে নিয়ে যায়। জীবন যে থেমে থাকে না। সেই গল্প কৌশিক আমাদের শুনিয়েছেন ঋত্বিক পরবর্তী শতাব্দীতে।

২২ মার্চ আলোচনার শেষ বক্তা ছিলেন অধ্যাপক শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত। তিনি দেশভাগের পরে মহিলাদের উপর কি প্রভাব পরে সেই বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। ওইদিন অন্যান্য যারা বক্তব্য রাখেন তাঁরা হলেন,  নিউ দিল্লীর ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ’-এর অধ্যাপক রবী বাসুদেবন, তিনি বলেন (Configuration of Partition: Exploring the Documentary and Newsreel Archive for south Asia) বিষয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডঃ সুদেষ্ণা ব্যানার্জি। তাঁর বিষয় ছিল, ( (Re) claiming the no-man’s land for the awaam: Bajrangi Bhaijaan ) অনুষ্ঠানের প্রথম বক্তা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রদীপ কুমার ঘোষ। প্রদীপবাবু তাঁর প্রারম্ভিক বক্তব্যে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন আমরা আর দেশভাগ চাই না। তিনি বলেন, ‘’উত্তর-পূর্ব ভারতে যে ধরণের আন্দোলন হচ্ছে সেটাতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল দিক রয়েছে। যে বিষয়টা অধ্যাপক মধুজা মুখোপাধ্যায় বলেছেন। সেই সব ছাত্র-ছাত্রী তাঁদের মেধা নিয়ে এগিয়ে আসবে।‘’

২৩ মার্চ আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। অনুষ্ঠানের অন্যতম ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ডঃ মধুজা মুখোপাধ্যায় একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যের কিছুটা অংশ আমাকে বললেন। তাঁর বিষয় ছিল (Train to Sealdah: Walking the Thoroughfare of History)।  তিনি বলেন, ‘’আমি সেদিন বেছে নিয়েছিলাম ইতিহাসের পাতা থেকে কলকাতার বৌ বাজার অঞ্চলের একটি উদ্বাস্তু পরিবারের গল্প। এটি ব্যক্তিগত অভিঞ্জতা। একটা রাস্তাকে ধরে এই গল্প। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে এই গল্পের শুরু। তৎকালীন হ্যারিসন রোড থেকে দাঙ্গা শুরু হয়। শিয়ালদহ উদ্বাস্তু শিবিরে যারা থেকেছেন তাঁদের গল্প। শিয়ালদহ, বৌ বাজার, কলেজ স্ট্রীট এই তিনটে রাস্তাকে কেন্দ্র করে সামাজিক অস্থিরতা ছিল আমার মূল বিষয়। সেই দেশভাগের সময় মানুষ কি মূল্য দিয়েছেন সেই বিষয়ে বলেছি। আমরা আর আমাদের দেশের নতুন করে ভাগ চাই না।‘’

আমি মনে মনে বলছিলাম আমার বাবা বসন্ত চৌধুরী আমার মা, দু’ই দাদা এবং দিদিদের নিয়ে শিয়ালদহ সহ একাধিক উদ্বাস্তু কলোনিতে থেকেছেন। সেইসব দিনের গল্প আমার স্মৃতিতে রয়েছে। আমিও দেশভাগ আর চাই না। মননশীল মানুষ চাই। উদার গণতন্ত্র চাই।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

‘তোমাদের টার্গেট যদি হয় বাংলা, বাংলার টার্গেট লালকেল্লা’

কথাটা এখন ট্রেনে বাসে আলোচনা হচ্ছে। উনি কি ফেডারেল ফ্রন্টের কথা বলছেন? উনি কি তৃতীয় ফ্রন্টের কথা বলছেন? কার কথা কেন বলছেন এটা আমরা সবাই জানি। কিন্ত আমি প্রশ্ন তুলতে চাইছি তৃণমূলনেত্রী অরাজনৈতিক একটা মঞ্চকে দ্বিতিয়াবারের জন্য বেছে নিলেন কেন? ৮ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ওইদিন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য মহিলা কংগ্রেস আয়োজিত সম্মেলনের জনসভায় আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। ধর্মতলায় গাঁধীমূর্তির পাদদেশে এইসভা ছিল। সাতবছর পর তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও জনসভায় থাকার সুযোগ হল। আমন্ত্রণ ছিল এই জনসভায় হাজির থাকার জন্য। সংবাদ মাধ্যমে সেদিনের বলা তৃণমূলনেত্রীর কিছু কথা প্রকাশ হয়েছে। খুব সম্ভবত সেদিনের বলা সবকথা সংবাদ মাধ্যম লিখতে পারেনি। মমতা ৮ মার্চ  আন্তর্জাতিক নারীদিবসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মহিলাদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে সরাসরি চলে যান সিপিএম এবং বিজেপির রাজনীতিতে। তিনি বলেন, ‘’আমি জানি সিপিএম কেন আত্মসমর্পণ করল। আমি ত্রিপুরার কথা বলছি।  সিপিএমের পাঁচটা লোক গ্রেফতার হলে হত। কিন্তু কেন আত্মসমর্পণ করলেন? যত আত্মসমর্পণ করবেন বিলীন হয়ে যাবেন আপনারা।‘’

তৃণমূলনেত্রী সেদিনের জনসভায় আরও বলেন,  ‘’আমি জানি কেন্দ্র কোন কোন এজেন্সিকে কাজে লাগিয়েছে। এতে ভয় পাওয়ার কি আছে? আমাদের রাজ্যেও এটা করা হচ্ছে। আমরা ভয় পাচ্ছি না। সিপিএম কেন ভয় পাচ্ছে? আপনারা কেন ভয় পাচ্ছেন? ত্রিপুরায় বিজেপি এসেছে। এসেছে ঠিক আছে। তোমরা কাজ কর। বাংলার কথা ভেবনা। তোমাদের টার্গেট বাংলা আমাদের টার্গেট দিল্লি।‘’

তৃণমূলনেত্রী ওইদিনের জনসভায় ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে আগাম স্লোগান বেঁধে দিলেন। বললেন, ‘’আমাদের ঘরে ঘরে মেয়েরা উন্নয়নের দায়িত্ব নিচ্ছে। আমরা সমস্ত আঞ্চলিকদল লড়াই করব। খালি হিন্দু-মুসলিম করলে দেশ চলবে না। মহিলারা দিচ্ছে ডাক বিজেপি বিদায় নিক। ২০১৯ বিজেপি হবে ফিনিশ।‘’

আমি ওইদিনের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য তথা সাংসদ মহম্মদ সেলিমকে ফোন করেছিলাম। তিনি সম্মেলনকক্ষে ব্যস্ত ছিলেন তবু ফোনটা ধরলেন। বললেন, ‘’বিজেপির বিরুদ্ধে যখন একের বিরুদ্ধে এক লড়াইয়ে এগনো হচ্ছে, তখন মমতা তৃতীয়ফ্রন্ট গঠনের কথা বলে বিজেপির হাতই শক্ত করছেন কিনা ভেবে দেখ।‘’

পরে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘’মুখে উনি যাই বলুন, তৃণমূলের কথায় আর কাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বরং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল যা করছে, তাতে বিজেপি বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে।‘’

কমরেড সেলিমদা আরও জানান, ‘’এই কথায় রাজনৈতিক চাল নেইতো? আমাদের কথা তৃণমূলনেত্রী বলে দিচ্ছেন? কেন? আগামীদিনে বাম ভোটাররা জোড়াফুলে ছাপ দিতে পারেন। আমরা সতর্ক আছি।‘’ মহম্মদ সেলিমের আমাকে বলা কথার প্রসঙ্গে তৃণমূলের এক শীর্ষনেতার কাছে কারণটা জানতে চেয়েছিলাম। মহিলা সমাবেশের দিন মঞ্চের নীচে একাধিক শীর্ষনেতা বসে ছিলেন। সুব্রত বক্সি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ইন্দ্রনীল সেন, ফিরহাদ হাকিম। সেদিন মমতা বলেন, আমাদের একঝাঁক শীর্ষনেতা মঞ্চের নীচ বসে আছেন। মহিলা সমাবেশের মঞ্চে তাঁরা আসবেন না। তাঁরা নাকি আমাদের পাহারা দিচ্ছেন। আমি সবাইকে বলছি মঞ্চে আসতে। এঁদের একজনের সঙ্গে গতকাল শনিবার আমার ফোনে কথা হয়। নাম প্রকাশ করব না এই শর্তে তিনি বলেন, ‘’ত্রিপুরায় বামফ্রন্টের হারের পরে বামপন্থীদের মনোবল প্রায় তলানিতে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সিপিএমের ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে চলে যেতে পারে। তাই হয়ত দিদি সিপিএমকে বাচানোর চেষ্টা করছেন। সিপিএমের এই টালমাটাল সময়ে সিপিএমের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন আমাদের নেত্রী। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় নবান্নের ‘ফিসফ্রাই কূটনীতি’-র কথা। সেদিন তৃণমূলনেত্রী যদি সঠিক ছিলেন তবে আজকের বাস্তবতায় নয় কেন? সিপিএমের কি এখন ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থা? গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু স্থায়ী শত্রু বলে কি কিছু হয়? তাহলে আমাদের দলে যে সব নেতা একসময় নেত্রীর বিরোধিতা করেছিল তাঁরা কি তৃণমূলে আসতে পারতেন না থাকতে পারতেন? তাঁরা স্বসম্মানে আছেন। আপনি নিজেও রাজনৈতিক দাবার বোড়ে হননি। সেইজন্য আপনি সবটাই জানেন। সৎ সাংবাদিকতার জন্য অনেক মূল্য আপনি দিয়েছেন।‘’ ভদ্রলোক আমাকে তুমি বলে এতদিন সম্বোধন করে এসেছেন। কাল আপনি কেন বললেন জানি না।

উল্লেখ্য তৃণমূল শীর্ষনেতার কথা শুনে মনে পড়ল, ত্রিপুরায় মন্ত্রীসভার শপথের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের হাত ধরে বললেন, ত্রিপুরায় সম্পূর্ণ আনকোরা কিছু তরুণ সরকার চালানোর দায়িত্ব পেয়েছেন।  রাজ্যে সরকারকে সঠিকভাবে চালাতে গেলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। শপথ গ্রহণ মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার সময় ভারতের বর্তমান সময়ের সব থেকে আলোচিত, বিতর্কিত সংসদীয় ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদী দিল্লি আসার আহ্বান জানালেন সিপিএম নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের প্রতি। তিনি বললেন, ‘দিল্লি আসুন কথা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গণতান্ত্রিক এবং ভারতীয় সংসদীয়  সৌজন্যের পরেই ত্রিপুরার তরুণ বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব পূর্বসুরীর দেখানো সৌজন্য মেনেই মানিক সরকারের পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলেন। এবং আশীর্বাদ নিলেন।

আমরা বুঝে যাই রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে যেটার খুব বেশি প্রয়োজন। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রি, ইন্দিরা গাঁধি, রাজীব গাঁধি, অটলবিহারী বাজপেয়ী, ডঃ মনমোহন সিংহ সকলেই ভারতীয় সেই সংসদীয় রীতিনীতীর কথা বলে গিয়েছেন। যে নীতি আজ প্রোথিত হয়েছে গভীর শিকড়ে। এবং  ওইসব প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছেন ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিফলিত করতে। যদিও বিরোধীরা অভিযোগ করে থাকেন নরেন্দ্র মোদী নিজের দলের কারোর সঙ্গে কথা বলেন না। সেখানে বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি? কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গাঁধি সরাসরি আক্রমণ করে বলছেন, ‘স্যুটবুটে’-র সরকারের প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় রীতিনীতি মানলে দেশের বিতর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে মুখ খুলতেন। চুপ করে থাকতেন না। ডোকলাম সীমান্ত সমস্যা হোক বা ফ্রান্সের সঙ্গে র‍্যাফেলচুক্তি। কোনও বিষয়েই আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলেন না।‘’

ত্রিপুরার শপথমঞ্চ থেকে নেমে আসার পরে সিপিএম দলের অন্যতম সফল নেতা। সফল মুখ্যমন্ত্রী বর্তমানে প্রাক্তন। মানিকবাবু স্বভাবজাত অভ্যাসে বলেছেন, ‘’উনি বললেন ভালো ভালো কথা। কাজে কি হয় দেখা যাক! সরাসরি হিংসা বন্ধের ডাক ওই মঞ্চ থেকে এলে ভালো হত। আমরাও সংসদীয় গণতন্ত্র মেনেই রাজনীতি করি।‘’

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও ত্রিপুরায় শপথের দিনে দলের অসহিষ্ণু কর্মী সমর্থদের বার্তা দিতে চেয়েছেন। ভোট শেষ রাজনৈতিক শত্রুতাও শেষ। কিন্তু এটা কি হয়? হয়ে থাকে? উপরের স্তরে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঠিকঠাক পর্যায়ে রেখে কূটনৈতিক শব্দবাক্যের ‘মিউজিক্যাল’ তাল লয় ছন্দ আমরা জানি। খেসারত দিতে হয়। নীচের তলার কর্মীদের। খুব সম্ভবত সেই কথাটা ভেবেই তৃণমূলনেত্রী ত্রিপুরা বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের আগেই সিপিএমের উদ্দেশ্যে বিধানসভায় বলেছিলেন, ‘’আপনারা জিতলে খুশি হতাম।‘’

আমরা শিরোনামে যে লাইনটা ব্যবহার করেছি তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৮ মার্চের সভার আগে চলতি মাসের পুরুলিয়ার একটি জনসভায় আরও আক্রমণাত্বক ভাষায় লালকেল্লায় যাওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি বিজেপির উদ্দেশ্যে বলেন, ‘’তোমাদের টার্গেট যদি হয় বাংলা, বাংলার টার্গেট লালকেল্লা। বাংলা নিজে বসবে না। অন্যকে বসাবে। এটা বাংলার সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য।‘’

প্রায় দেড় বছর বাকি আছে লোকসভা ভোটের। কিন্তু পরবর্তী সাধারন নির্বাচনের দামামা ইতিমধ্যেই বাজতে শুরু করেছে। ৮ মার্চ নারী দিবসের মঞ্চে মমতা দাবি করেন বিজেপিকে বধ করতে প্রয়োজন তৃতীয় ফ্রন্টের। তিনি বলেন সব আঞ্চলিক দল সঙ্ঘবদ্ধ হব। সকলে একসঙ্গে লড়াই করব। অন্যায়ের প্রতিবাদ করব। আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে একছাতার তলায় আসতে সিপিএমকে সঙ্গে নিতেও তার আপত্তি নেই। সেই কথাও সেদিন তিনি কৌশলী ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার সহ যেসব রাজ্যে কংগ্রেস শক্তিশালী সেইসব রাজ্যে বিজেপিকে হারানো সহজ হবে না। তাই মমতার চাইছেন ওড়িশার বিজু জনতা দল, তামিলনাড়ুতে ডিমকে, তেলেঙ্গনায় তেলঙ্গনা রাষ্ট্রীয় সমিতি, অন্ধ্রপ্রদেশে তেলেগু দেশমের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। তা হলে বিজেপি অনেকটা ধাক্কা খাবে। তৃণমূল সূত্রের খবর বহজন সমাজ পার্টি, সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা, এনসিপি সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন নেত্রী। সেদিনের নারী দিবসের জনসভায় পুনরায় মমতা বলেন, ‘’তৃণমূল আত্মসমর্পণ করবে না। বাংলা নেতৃত্ব দিয়ে পিছনে থাকবে। বিজেপি তোমাদের বিসর্জন দেব।‘’

গত কয়েকদিনের বিভিন্ন জনসভায় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয় ফ্রন্টের কথা বললেও কংগ্রেসের নাম উচ্চারণ করেননি। কিন্তু লক্ষ করার মত বিষয় পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যসভা ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী অভিষেক মনু সিঙঘভিকে সমর্থন করার দিনেই তৃণমূলকে জোটবার্তা দিয়েছেন কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সনিয়া গাঁন্ধি। জোট গড়ে উঠার প্রাক্কালে সনিয়া এদিন বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে বিজেপি-বিরোধী দলগুলিকে একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছেন। কংগ্রেস এবং তৃণমূল দু’ই দলের দু’ই নেত্রীর সম্পর্কের ব্যাকারণটা আমরা সবাই জানি। ৯ মার্চ মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে সনিয়া বলেন, ‘’সব দলের একসঙ্গে আসা কঠিন। কারন, নীচের স্তরে একে অন্যের প্রতিপক্ষ। পশ্চিমবঙ্গ-সহ অনেক রাজ্যে এই পরিস্থিতি। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে মতপার্থক্যকে রাজ্যে রেখেই একসঙ্গে আসা দরকার।‘’

কংগ্রেস সূত্রে খবর আগামি সপ্তাহেই বিজেপি-বিরোধী দলগুলিকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সনিয়া গাঁন্ধি। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। কংগ্রেসের আশা ওইদিনের নৈশভোজে ভারতের সর্বজনীন ‘দিদি’ থাকবেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবেই থাকবেন। সেই সভায় সিপিএম নেতৃত্ব থাকলেও তিনি সংসদীয় এবং গণতান্ত্রিক ধারাপাত মেনেই আলোচনায় অংশ নেবেন। এই নিবন্ধ লেখার সময় আমার একটি লেখার কথা মনে হল। সম্প্রতি একটি বই পড়ছি। নেপাল মজুমদারের লেখা ‘ভারতের জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ’। জানি না পুরো বইটা পড়তে পারব কিনা। বিভিন্ন সামাজিক কারণে বাড়িতে বেশিক্ষণ লেখাপড়ার কাজ করাটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক। গত কয়েক বছরে যে অভিঞ্জতা হয়েছে এটা ভবিষ্যতে আর কারও যেন না হয়।

নেপাল মজুমদার লিখছেন, ‘’লক্ষৌ কংগ্রেসের (এপ্রিল ১৯৩৬) অনতিকাল পরেই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য জওহরলালের উদ্যোগে যে ‘All India Civil Liberties Union’ গঠিত হয়, কবি তাহার অনারারি প্রেসিডেন্টরূপে এই আন্দোলনের প্রায় ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই আন্দোলনে কবির অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন ঞ্জাপন করিয়া রোমা রোলাঁ এক পত্রে কবিকে লিখিয়াছিলেন (৫ই ডিসেম্বর, ১৯৩৭)

‘’In the Bulletin of the ‘Indian Civil Liberties Union’, which I receive from time to time, I read your great name always in the frontline of the sacred struggle for the defense of liberty and for justice.

You know that in the West I take part in the same battles, which are still more desperate: for the circle of enemies is fiercer and draws closer every day. But the awakening (social, moral and intellectual) of the workers and peasants of France is a joy and a great hope for me.

Especially since that last two or three years, they have become conscious of their unity and strength, as well as their duty towards guides like Jaures and a great poet like Victor Hugo- or like yourself. They deserve it” [Rolland And Tagore: P-71-72]    

 

 

Leave a comment

Filed under Uncategorized

কুলীন মল্লরাজাদের কৌলীন্য খুঁজতে বিষ্ণুপুরের ঘরে বাইরে

পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর নানা কারণে ঐতিহাসিক মর্যাদা দাবি করে। কিন্তু নগর সভ্যতার কুলীন শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মন-কায়েতদের ঘোট এই মর্যাদা থেকে বিষ্ণুপুরকে বঞ্চিত করে রেখেছে। দীর্ঘদিন অঞ্জাত এক কারণে টেরাকোটা কাজের মন্দির শহর বিষ্ণুপুর রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি দপ্তর এবং সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছে বিমাতৃয় ভাইয়ের মর্যাদায় থেকে গেছে। সাধারণ ভ্রমণ পিপাশু বাঙালিদের কাছে দু’একদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার স্থান হিসাবে বিষ্ণুপুর স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু মূলধারার পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে বিষ্ণুপুরকে কেউ স্বীকৃতি দিতে চায়নি। যে শহর নিজের মর্যাদায় দাবি করতে পারে ‘হেরিটেজ’ সংরক্ষণের।

সম্প্রতি বিষ্ণুপুর থেকে ঘুরে এসে আমার এমনটাই মনে হয়েছে। সূত্রের খবর রাজ্য সরকারের উন্নয়নের কাজের জন্য যে সব ‘উন্নয়ন পর্ষদ’ গঠন হয়েছে সেগুলির মধ্যে ‘পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ’ অন্যতম। নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে কুলীন শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ-কায়েতদের ঘোট টেরাকোটার ঐতিহ্য মণ্ডিত বিষ্ণুপুর শহরকে কোনও এক অঞ্জাত কারণে এই পর্ষদের বাইরে রেখেছে। এবং আরও একটি তথ্য বলছে বাঁকুড়া জেলার সদর শহর হয়ে ওঠার অন্যতম দাবিদার ছিল বিষ্ণুপুর। খুব সম্ভবত রাজনৈতিক কারণেই বিষ্ণুপুর বাঁকুড়া জেলার সদর শহর হয়ে উঠতে পারেনি। এর পিছনেও কি সেই অদৃশ্য রাজনৈতক ঘোট?

আসুন আমরা পুনরাবৃত্তি করি কুলীন শ্রেষ্ঠ মল্লরাজাদের ইতিহাস। ঐতিহাসিক তথ্য ইতিহাসবেত্তারা দেবেন। আমরা স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে তথ্য পাচ্ছি এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মন্ডল কতৃক প্রচারিত সংরক্ষিত স্থাপত্যের প্রচার বোর্ডের উপর কিছুটা নির্ভর করতে হচ্ছে। মল্লভূম রাজ্যের একদা রাজধানী বিষ্ণুপুর। যে কথা সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন। আনুমানিক এক হাজার বছর আগের এই মল্লভূম রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত ছিল বর্তমান বাঁকুড়া জেলা, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ জেলার কিছুটা অংশ, বিহারের ছোট নাগপুর ও উড়িষ্যার কিছু এলাকা। মল্লভূম রাজ্যের খ্যাতি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প বাণিজ্য, ব্যবসা বাণিজ্যে। এছাড়াও সুশাসন এবং রাজকীয় বীরত্বে ছিল অ-অনুকরণীয় এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

মল্লরাজাদের রাজত্বকাল ছিল সপ্তম শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত। শ্রেষ্ঠ মল্লরাজ বীরহাম্বীর নিজের শাসনকালে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি মল্লরাজের নতুন রাজধানী বিষ্ণুপুরে বসে একের পর এক স্থাপত্য গড়ে তোলেন। তার আগে ৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দে রাজা জগৎ মল্ল রাজধানীর ঠিকানা ‘প্রদ্যুম্নপুর’ থেকে মল্লরাজদের নতুন রাজধানী বিষ্ণুপুরে সরিয়ে আনেন। মল্লরাজা বীরহাম্বীর বৈষ্ণবগুরু শ্রী নিবাস আচার্যের পরমভক্ত ছিলেন। তার সময় থেকেই বিষ্ণু নামাঙ্কিত বিভিন্ন টেরাকোটার মন্দির গড়ে উঠতে থাকে। মন্দির এবং কিছু দর্শনীয় স্থানের উল্লেখ করছি।

১) রাসমঞ্চ ২) মদন মোহন মন্দির ৩) গুমগড়  ৪) শ্যামরায় মন্দির(পাঁচচূড়া মন্দির ৫) ছোটো পাথর দরজা ও বড় পাথর দরজা  ৬) লালজীউ মন্দির ৭) রাধামাধব মন্দির  ৮) মৃন্ময়ী দুর্গা মন্দির ৯) পাথরের রথ ১০) রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ১১) কৃষ্ণরায় জোড় বাংলা ১২) যুগোল কিশোর কৃষ্ণ বলরামের মন্দির ১৩) মহাপ্রভু মন্দির  ১৪) আচার্য যোগেশচন্দ্র মিউজিয়াম, (এই সংগ্রহশালায় স্থানীয় অঞ্চলে খননকার্য চালিয়ে যে সব ধাতব মূর্তি, পোড়া মাটির মূর্তি, লোকশিল্পের জন্য ব্যবহার করা হত এমন বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র সহ আরও মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী সংগৃহীত আছে।) ১৫) লাল বাঁধ ১৬) সর্বমঙ্গলা মন্দির ১৭) ছিন্নমস্তা মন্দির ১৮) দলমাদল কামান ১৯) মল্লেশ্বর ২০) মদনগোপাল মন্দির ২১) কালাচাঁদ ২২) নন্দলাল ২৩) রাধাগোবিন্দ ২৪) জোড়মন্দির শ্রেণীর মাকড়া পাথরের তৈরি পোড়া মাটির কারুকার্য করা দেব দেউল। এই লেখায় টেরাকোটার কাজ করা দু’টি স্থাপত্যের বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। প্রথমটি হল ‘রাসমঞ্চ’। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মণ্ডল কতৃক প্রচারিত বোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘’স্থাপত্য বিন্যাসে অদ্বিতীয় এই রাসমঞ্চটি বীরহাম্বীর কতৃক ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হইয়াছিল। উচ্চ বর্গাকার ভিত্তির উপর স্থাপিত এই ধর্মীয় সৌধটির উপরিভাগ পিরামিডের মত। মূল গর্ভগৃহটিকে তিনটি ধারাবাহিক খিলানাবৃত প্রদক্ষিণ করিয়া ঘিরিয়া রাখিয়াছে। ফুলকাটা খিলানগুলিতে পোড়ামাটির প্রস্ফুটিত পদ্মের অলঙ্করণ লক্ষ্য করিবার মত। মল্লরাজদের শাসনকালে রাস উৎসবে নিকটবর্তী সমস্ত মন্দির হইতে দেব বিগ্রহ এই রাস মঞ্চে আনা হইত। এই রাস মঞ্চের অনুরুপ অন্য কোন স্থাপত্য নিদর্শন হয় না।‘’

দ্বিতীয় স্থাপত্যটি হল শ্যামরায় মদির (পাঁচচূড়া মন্দির)। ‘’এই মন্দিরটি ১৬৪৩ খ্রীষ্টাব্দে মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ তৈরি করেন। বাংলা চালার ছাদে পাঁচটি শিখর বিশিষ্ট ইটের তৈরি পঞ্চরত্ন মন্দিরগুলির মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ। পোড়ামাটির অলংকরণও দেখবার মত।‘’ (ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মণ্ডল) এই মন্দিরের টেরাকোটার খোদাই করা টাইলসে তিনটি বৃত্ত আছে।  প্রথম ছোট বৃত্তটিতে রাধাকৃষ্ণ নাচছেন। পরের দুটি বড় বৃত্তে সখীরা নাচছেন। এইসব মন্দিরগুলির পুরাতাত্ত্বিক মূল্য অপরিসীম।

মল্লরাজ বীরহাম্বীর রাজ্যের প্রতিরক্ষা এবং প্রজাদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন বাঁধ (পরিখা) তৈরি করেন। এই সমস্ত বাধের নামকরণ করেছিলেন কালীন্দিবাঁধ, শ্যামবাঁধ, যমুনাবাঁধ, কৃষ্ণবাঁধ সহ আরও বিভিন্ন বাঁধ। সর্বমোট বাঁধ ছিল সাতটা। এক একটা বাঁধের জমির পরিমাণ আনুমানিক ১০০ একর। এছাড়াও কৃষিকাজ এবং পানীয় জলের জন্য পৃথক ব্যবস্থা হিসাবে ছিল গাঁতাত বাঁধ এবং বিভিন্ন সায়র। স্থানীয় বিধায়ক তুষারকান্তি ভট্টাচার্যের প্রস্তাব বাঁধগুলির পুনর্জীবন ঘটাতে পারলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘ জল ধরো জল ভরো’ প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করা যায়। তুষার বাবুর খুব কাছের লোক কলকাতার আলিপুর আদালতের আইনজীবী বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা পার্থসারথী ব্যানার্জী বললেন, ‘’বিষ্ণুপুরে পুঁথি সংরক্ষণ এবং এই বিষয়ে একটি গবেষণা কেন্দ্র করা যায় কিনা ভেবে দেখা হোক। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিষ্ণুপুর শাখায় আনুমানিক ৫ হাজার পুঁথি আছে। এইসব পুঁথির যথাযথ  সংরক্ষণের ব্যাবস্থা না থাকায় ১০০০ বছরের পুরনো এইসব পুঁথি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সাহায্য করলে রাজ্য সরকার বিষ্ণুপুরকে পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে দিতে পারে। আপনার কাছে আবেদন করব বিষয়টি সকলের নজরে আনার জন্য।‘’

স্থানীয় বিধায়ক তুষারকান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘’আমরা ইতিমধ্যে ভারতে দিল্লিতে অবস্থিত ফরাসী দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলেছি। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরগুলির নির্দিষ্ট এলাকাকে বেছে নিয়ে ‘হেরিটেজ’ প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য। কলকাতায় ফরাসী সংস্কৃতি চর্চার যে কেন্দ্র রয়েছে সেই আলিয়াস ফ্রাসেজেঁও আমরা যোগাযোগ করেছি। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একদফা কথা হয়েছে। বিষ্ণুপুরে পুরাতাত্ত্বিক মূল্য আছে এমন সব স্থাপত্যগুলিকে নিয়ে আলাদাভাবে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় কিনা ভেবে দেখার কথা বলেছি। আমি নিজে ফ্রান্সে গিয়ে সে দেশের মিউজিয়াম দেখে এসেছি। আমার প্রস্তাব টেরাকোটা শিল্পের যে সব মন্দির এবং অন্যান্য প্রাচীন দ্রষ্টব্য স্থান আছে, সেগুলিকে একটি কোর এলাকার মধ্যে আনা হোক। বিষ্ণুপুরের মধ্যেই আলাদা ‘টেরাকোটার শহর’ হবে সেটা। বিষ্ণুপুর শহরের সৌন্দর্যায়নের কথা আমরা আলাদাভাবে ভাবছি।‘’

আইনজীবী এবং বিষ্ণুপুরের সমাজকর্মী পার্থসারথী ব্যানার্জী আরও বলেন, ‘’বিষ্ণুপুরে আগে অ্যালয় স্টীল কারখানা ছিল। বন্ধ হয়ে গেছে। সিল্ক-খাদি শিল্প ছিল। ধুঁকছে। বালুচরি শাড়ি, সিল্ক-খাদি শিল্পে তিন হাজার মানুষ কাজ করতেন। তাঁরা সবাই বেকার। এছাড়া ডোকরা শিল্প, পোড়া মাটির শিল্পের অবস্থাও ভালো নয়।‘’ পার্থবাবুর সঙ্গে কথা বলার পরে সুযোগ হয়েছিল স্থানীয় সাংসদ সৌমিত্র খাঁ-এর সঙ্গে কথা বলার। সৌমিত্র খাঁ বললেন, ‘’ হ্যা আমি সাংসদ হিসাবে সমস্ত বিষয়টা জানি। কৃষ্ণগঞ্জে যমুনা বাঁধের পাশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক করছি আমরা। সেই পার্কে এইসব শিল্পগুলির জন্য আলাদ ব্যবস্থা থাকছে। এছাড়া আমাদের ‘বিশ্ব বাংলা’ বিপণিতে বাঁকুড়ার গামছা, বিষ্ণুপুরের বালুচরি শাড়ি, ডোকরাশিল্প এবং শঙ্খশিল্প বিপণনের জন্য আমার সঙ্গে কথা হয়েছে।‘’

Leave a comment

Filed under Uncategorized

ধ্রুপদী উপকন্ঠের ঝর্ণাভেজা সুরে সুরে

আমি আজ অনেক অনেক দূরত্ব থেকে নিজেকে খুঁজতে থাকি। এইতো বল? বলনা?  সেদিন শীত গেছে! সে এমন কি? শীত কতবার আসে কতবার ফিরে চলে যায়। কিন্তু বসন্ত বৌরি কি অভিমান করে বসে থাকে? গোঁসাই থাকলে কি বলত? শ্রী-কান্ত কমললতার গফরের কথা মনে পড়ছে। গফর গান খোঁজে মানুষের গান। বসন্তেভেজা ফাগুন লাল ‘বৌ কথা কও’ পলাশ গাছের পাখির গান। কোকিল বলে আমাকে মানবসভ্যতা গানের সাম্রাজ্যে শ্রেষ্ঠ বলেছে। আমি ক্লান্তিহীন সঙ্গীতের সুরে নিজেকে উজাড় করে দেব। কিন্তু ওকে কি নামে ডাকবেন ‘পিউ কাঁহা’? ‘বোউ কথা কও’, ‘চোখ গেল’? কোকিলের পাশে পাশে সেও আছে শীত শেষের বেলায়। শীতের শুরুতে বর্ষার ঝর্ণাভেজা ‘টাপুর টুপুর’ সন্ধ্যের আকাশের তারাদের আলোর সুরে সুরে। যেন ধ্রুপদী উপকন্ঠের পড়শির খোঁজে।

কলকাতার উপকন্ঠে আমরা খুঁজে পেলাম স্বর-সঙ্গীত ঋতুর মুক্ত মঞ্চ। ‘দ্য ফিফথ নোট’ (The Fifth Note)। কলকাতার গড়িয়ার কাছে নাকতলায় গড়ে উঠেছে একটি নতুন ইন্সটিটিউট। এই সংস্থা দায়িত্ব নিয়েছে কলকাতা তথা বাংলার ধ্রুপদী গানের মর্যাদাকে ফিরিয়ে দিতে। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী উস্তাব রাশিদ খানের ( জন্ম ১ জুলাই ১৯৬৬) -র নাম আজ শুধু সঙ্গীতপ্রেমী কলকাতা নয়। সারা বাংলা তথা সারা ভারতের ধ্রুপদী সঙ্গীতের গুণমুগ্ধরা জানেন। বিদেশের সঙ্গীত মঞ্চেও উস্তাদ রাশিদ খান বিশেষভাবে বিশেষ মর্যাদায় নিজের স্থান পাকা করে ফেলেছেন। তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী ঘরানার সঙ্গীত শিল্পী। এবং অবশ্যই সেটা ‘হিন্দুস্থানী সঙ্গীত’ ঐতিহ্য মেনে। উস্তাদ রাশিদ খান ‘রামপুর শাস্তায়ন’ ঘরানা মেনে চলেন। এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা হলেন উস্তাদ রাশিদ খানের প্রপিতামহ ইনায়েত হুসেন খান।

উস্তাদ রাশিদ খান বাংলার মাটি বাংলার জলের ঋণ মেটাতে চাইছেন সম্ভবত। জন্মভূমীর ঋণ মেটাতে চাইছেন।   বাংলার কাছে তিনি কৃতঞ্জ। সেই চিন্তা থেকেই কি এই ‘দ্য ফিফথ নোট’ সংস্থা? এই সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিচ্ছে বাংলা থেকে নতুন প্রতিভা গড়ে তোলার। ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করা এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র ধ্রুপদী সঙ্গীতের শিল্পী গড়ে তোলা নয়। প্রতি শুক্রবার ইন্সটিটিউটের সভা ঘরে বিভিন্ন শাখার ধ্রুপদী শিল্পীদের জন্য রয়েছে ধ্রুপদী সন্ধ্যা। প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নয়। পাশাপাশি রয়েছে শহরের নামজাদা সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখার খ্যাতনামা শিল্পী, পণ্ডিত, উস্তাদদের ‘লাইভ’ অনুষ্ঠান। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মনন তৈরি করতে যা সহায়ক হয়ে উঠবে। গত শুক্রবার (২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮) এমনই একটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে আমন্ত্রণ পেয়ে উস্তাদ রাশিদ খানের আশ্রমে চলে গিয়েছিলাম অনুষ্ঠান শুনতে। চারতলায় ‘দরবার’ হলের পেছনে সবুজ হলুদ ফ্লেক্সে লেখা ‘The Fifth Note Evening Darbar, 365 days more than 96 Artists, Let’s make Kolkata once again.The cultural capital of the country. Every Friday at 6 pm at Darbar Hall’. 

নিজের মায়ের নামে গড়ে তোলা ‘শাখেড়িবেগম মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ এবং টাটা ক্যাপিটালের সঙ্গে যৌথভাবে এই অনুষ্ঠান করছেন উস্তাদ রাশিদ খান। শুক্রবারের প্রথম অনুষ্ঠান ছিল রাগপ্রধান গানের। শিল্পী ভ্রামন্তী সরকার। আকাশবাণীর ‘বি-হাই’ শিল্পী ভ্রামন্তী। প্রথম গান ছিল পুরিয়া রাগ থেকে। আমি গানের ব্যাকারণ জানিনা। কিন্তু ভ্রামন্তীর স্বর প্রেক্ষাপণ এবং চর্চিত গলার মাধুর্যে আমরা মোহিত হয়ে গেছি। নিঃশব্দ দরবার হলে আমরা শ্রোতারা শুধু সঙ্গীতের ঝর্ণার জলপ্রপাতের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সঙ্গে তবলা লহরার বোল। তবলায় ছিলেন বিলাল খান। হারমোনিয়ামে ছিলেন আহমেদ আলি। রাগপ্রধান সঙ্গীত শিল্পী ভ্রামন্তী ভারতীয় সংস্কৃতির ঘরানা মেনে অত্যন্ত ভদ্র। এবং গুরু গৃহের পরম্পরায় সামজিকভাবে শিক্ষিত। পরের অনুষ্ঠান ছিল পণ্ডিত জ্যোতি গুহের একক হারমনিয়ামের সঙ্গীত। সঙ্গে তবলায় ছিলেন সৌরভ গুহ। এক মঞ্চে বাবা ছেলের ‘যৌথ সঙ্গীত সন্ধ্যা’। অনবদ্য বোঝাপড়া। তরুণ তবলচি সৌরভ আমাদের পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ এবং পণ্ডিত তন্ময় বসুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। পণ্ডিত জ্যোতি গুহের আলাদা করে পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রবীণ শিল্পী একাধিক ভারতীয় ঘরানার নামজাদা শিল্পীদের সঙ্গে হারমনিয়াম বাজিয়েছেন। অত্যন্ত সংস্কৃতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠান শুরুর প্রথমেই যে প্রাককথন বললেন পণ্ডিত জ্যোতি গুহ, তাতেই বোঝা গেল তাঁর সঙ্গীতের প্রতি বিনম্র একাগ্রতা। পণ্ডিত গুহ নিজের কৃতঞ্জতা জানালেন উস্তাদ রাশিদ খানকে।

আমি এই লেখায় ‘দ্য ফিফথ নোট’-এর ফেসবুক পেজের পরিচয় থেকে কিছুটা উল্লেখ করলাম পাঠকদের সুবিধার জন্য। আমরা আশা করব উস্তাদ রাশিদ খানের গড়ে তোলা এই প্রচেষ্টায় ‘নাগরিক কলকাতা’ সামিল হবে। বৃহত্তর এরিনায় এই মঞ্চের শিল্পীদের পৌঁছে দিতে।

‘’The City of Joy is all geared up for news that’s music to the ears. The Shakhri Begum Trust, a foundation dedicated to the art of imparting the best in Hindusthani Classical Music is all set to launch its unique new initiative – The Fifth Note. Pioneered by Indian Classical Music doyen Ustad Rashid Khan, The Fifth Note (TFN) is the first of its kind endeavour to harness and identify musical talent as also to sculpt performance-ready musicians from those that choose to take advantage of this never-before opportunity. With the formal launch slated on October 13, 2016, TFN is getting ready to provide a sneak peek to what’s in store in a precursor scheduled for the 5th and 6th of October, 2016.

At the core of the new initiative is an appeal to revive the purest form of Indian Classical Music. This takes its roots from the Gurukul Parampara where the Guru-Shishya bond was revered and accepted as the authentic and true essence of learning what is not merely music but an extension of life itself. As times have flown, music has become easier, accessible and unfortunately adulterated with too much convenience and gadgetry. We are in the times of picking up lyrics and sur off the internet and showing up in shows and hitting the stage without the firm foundation that the Gurukul was known for. And yet expectations have reached an all-time high, where parents spend fortunes on providing the best of facilities and children feeling the pressure of aspirations that include fame, success, and fortune. It is in these times, that The Fifth Note can be change-maker, bringing fresh hope and replenishment in a time-starved society where talent is hidden in every nook and corner.’’ 

Leave a comment

Filed under Uncategorized

আর্থিক উন্নয়ন এবং সংস্কৃতির উৎকর্ষের সাধারণ মঞ্চে দুই দেশ

আর্থিক উন্নয়ন এবং সংস্কৃতির উৎকর্ষের

সাধারণ মঞ্চে দুই দেশঃ

গত কয়েক মাস যে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় পাচ্ছি তাতে বলা চলে পথ চলার রাস্তায় আলো এসে পড়ছে। আলো থাকে। দু’ই পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকলে আলো চুঁইয়ে পড়বেই। গণতন্ত্রের দু’ই বুড়ো পাহাড়ের আলো খুঁজতে যেতে হয় না। সাধারণ মঞ্চে সাধারন দৃষ্টিতেই এই আলো আমরা অবলোকন করতে পারি। গত কয়েকমাস যাবৎ ‘মাধুকরী’ করার সুযোগ আমাকে দেওয়া হচ্ছে। এই সনাতনী ‘মাধুকরী’ থেকে সকলে জানে অর্থ ভিক্ষা আসে। স্বধর্মে নিজের অবস্থান থেকে আমি বলতে চাইছি ‘নাগরিক কলকাতা’ সকলকে নাগরিক সভায় আহ্বান জানায় না। নিজের ভাষা, শব্দ ইত্যাদি জানাতে ‘সাংস্কৃতিক মাধুকরী’-র সুযোগ কজনে আর পায়? কলকাতা শহরের অলি গলির গোলক ধাঁধায় যে ভিড় জমে থাকে সেই ভিড়ের মধ্যে স্থান করে নেওয়া খুব কিছু সহজ নয়।

জীবন যুদ্ধে হাঁটতে হাঁটতে ‘গর্বের বাংলা’-র কলকাতায়, নাগরিক কলকাতায় কে স্বজন? আর কে স্বজন নয় সেই প্রারম্ভিক বিচ্ছুরিত সূত্রায়ন আমারা খুঁজি। কখনো বেঁচে থাকার জন্য সান বাঁধান ফুটপাথে আমরা সবাই ছুটছি। অতীতের ডেয়ার পার্ক বর্তমান কলকাতার পার্কস্ট্রীটে ফুটপাথ ছিল না। কিন্তু ঝা চক চকে পার্কস্ট্রীট নামক রাস্তাকে আজও  ‘ডিয়ার পার্ক’-এর অভিধা দেওয়া যায়। উন্মুক্ত পার্কস্ট্রীটের ফুটপাথে হাঁটলেই ‘ডিয়ার পার্ক’-র আভিজাত্যের অধিকার পাওয়া যায় না। ‘ফ্রিস্কুল’ স্ট্রীটের রাতের পরিভাষা চিনতে হবে। সেই পরিভাষার অলংকরণ শিখতে হবে। তারপর লাল-সবুজ গালিচার সুগন্ধি আবাসনের কলকাতায় তুমি নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু মানুষ গড়ে তোলা, মনন গড়ে তোলা? এই দায়িত্ব তাকেই দিতে হয়, যে বলতে পারে আমারতো আপিস নেই, আমারতো ওজর নেই। মানে আমার অহংকার নেই।

হ্যাঁ সেই দায়িত্ব নিয়ে নাগরিক কলকাতায় আরও অনেকের সঙ্গে বর্তমানে পশ্চিমের সভ্যতার দু’জন আছেন। তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন ক্রেগ হল। পরিচয়ের জন্য নিজের চেয়ারটা তাঁর কাছে বড় কিছু নয়। তিনি কলকাতা এবং কলকাতার উপকণ্ঠে মনন গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছেন। মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করছেন। আমেরিকা উপ দূতাবাসের তিনি কনসাল জেনারেল। কলকাতার কনসাল জেনারেল ক্রেগ হল আড়াল থেকে আমেরিকা এবং ভারত নামক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে এমন দু’টি ধ্রুপদী দেশের মেল বন্ধন গড়ে তুলছেন। অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আর্থ-রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রকে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে অকৃপণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কলকাতার কনসাল জেনারেল ক্রেগ হলকে সামনে থেকে সাহায্য করছেন তাঁর দপ্তরের সহকর্মী, বর্তমান কলকাতাস্থ আমেরিকান সেন্টারের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অফিসার এবং ডিরেক্টর জেমী ড্রাগন।

আমেরিকান সেন্টারের আমেরিকান লাইব্রেরির নাম জগৎ বিখ্যাত। সেই লাইব্রেরির দায়িত্বে সপ্তাহ শেষে হলিউডের ক্ল্যাসিক সিনেমা দেখার  অভিঞ্জতা অনেকেরই আছে। বাংলার ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী প্রায় সকলকে এই পাঠাগারে যেতে হয়। আভিজাত্য চিনতে অথবা আভিজাত্য শিখতে। ঞ্জান চর্চার এমন একটি প্রতিষ্ঠানে  গত কয়েক মাস আমিও যাচ্ছি। সিনেমা দেখছি এবং বিভিন্ন মেধা ভিত্তিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছি। নিজেকে গড়ে তুলছি। নিজেকে চিনতে পুনর্মুল্যায়ন করছি। সম্প্রতি ‘ন্যাচারাল অ্যালায়েস এ রেস্ট্রোপেক্টিভ অব ইউ-এস ইন্ডিয়া রিলেশনস’ নিয়ে আলোচনা করলেন রেখা দত্ত। পি এইচ ডি রেখা দত্ত ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিকাল সাইন্স ও সোসিওলজি মনমউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার স্কলার এবং ভারতের হরিয়ানার জিন্দাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিটিং প্রফেসার।

আমেরিকা এবং ভারত নামক দু’টি দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেন রেখা দত্ত।  মতবিনিময় এবং তুলনামূলক আলোচনাসভায় ৮ জানুয়ারি তিনি দু’টি দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, টানাপড়েন এবং বর্তমান সময়ের সম্পর্কের গভীরতা আমাদের সামনে তুলে ধরেন। রেখা দত্ত প্রথমেই উল্লেখ করেন ‘আমি ভারত-আমেরিকা নামক দু’টি দেশের ছাত্র। আমার এই বিষয়ে আগ্রহ আছে। প্রেম আছে। ভালোবাসা আছে।’

তারপরেই আলোচনায় চলে যান। বলেন, ‘’দুই দেশের ঐতিহাসিক সমস্যা কোথায় আমাদের খুঁজতে হবে। এই সম্পর্ক ন্যাচারাল সম্পর্ক। যার সূত্রপাত হয়েছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আমলে। নেহরুর সময় ভারতের বিদেশনীতি ছিল আদর্শবাদী। পরে আমরা ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় পেরিয়ে এসেছি। সেই সময়টা ভারত-চিন একটা মেরু ছিল। আবার চিন যুদ্ধের পরে ভারত নতুন অক্ষে ঢুকে পড়ে। ভারত আমেরিকার সম্পর্কে পাকিস্তান একটা উল্লেখযোগ্য বিষয়। ১৯৮২ সালে ইন্দিরা গাঁধি এবং রোনাল্ড রেগনের উদ্যোগে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হয়েছিল। সেই সম্পর্কের ভিত শক্ত করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধি। ১৯৮৫ সালে রাজীব গাঁধি আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ভারত উৎসবে আসার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো জায়গায় যায়। অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং জর্জ বুশের সঙ্গে বৈঠক করে এই সম্পর্ক আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। ১৯৯০ সালে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত আমেরিকার সম্পর্ক আরও আরও ভালো জায়গায় যায়।‘’

রেখা দত্ত বলেন, ‘’১৯৯১ সালে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি আধুনিক বিশ্বের কাছে উদাহারণ হিসাবে পৌঁছে দিয়েছেন ডঃ মনমোহন সিংহ এবং জর্জ বুশ (জুনিয়র)। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় দুই দেশের আর্থিক সম্পর্কের বৃদ্ধি হয় ৬০%। অসামরিক পরমাণু চুক্তি, তথ্য-প্রযুক্তি, কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি হয়। ডিফাইনিং পার্টনারশিপ অব দ্য টোয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি বলা যেতে পারে।‘’ রেখা দত্ত উল্লেখ করছেন বর্তমান ভারত আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি নিয়েও। তার কথায়, ‘’বিশ্বে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। ২০১৪ সালে ভারতে প্রধানমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদী। আমেরিকায় ২০১৬ সালে এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই দেশের সম্পর্ককে বলা যেতে পারে প্রুডেন্সিয়াল সম্পর্ক। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের পরে ভারত অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী দেশ। জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আর্থিক এবং উন্নয়নের মানদণ্ডে বর্তমান ভারতকে তুলনা করা চলে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন ‘ইন্ডিয়া ইজ আ ট্রু ফ্রেন্ড’। আর মোদীর কনসেপ্ট হচ্ছে ‘Prudencial pragmatic concept’.‘’

আলোচ্য প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে সেদিন রেখা দত্ত বলেছিলেন, ‘’হ্যা বলতে দ্বিধা করব না, বর্তমান ভারতে দলিতরা আক্রান্ত। আবার আমেরিকাতেও বিচ্ছিনভাবে হলেও বর্ণ বিদ্বেষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে আমেরিকা এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে আসার রাস্তা খুঁজছে। দু’টি উন্নত গণতন্ত্রের দেশে মানুষ আছেন, সমাজ আছে তাই বিশ্বাস করি আমরা এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে আস্তে পারব।‘’

ডঃ রেখা দত্তের পরে পরেই আমরা পেলাম মিজোরাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের শিক্ষক, অধ্যাপক এইচ কে লালদিনপুরি ফেন্টকে। ২৫ জানুয়ারি ‘ফুল ব্রাইট লেকচার সিরিজ’-এ তিনি বলেন ‘এথনিক অ্যান্ড দ্য ইমিগ্র্যান্ট এক্সপেরিয়েন্স’ নিয়ে। তার কথায়, ‘’Ethnic identity is the awareness of a person affiliation with a creation ethnic group. …….Individuals with achieved ethnic identity ( Commitment) identify themselves as….’’  দু’দিনের উল্লেখিত মতবিনিময় আলোচনায় ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নিয়েছিল। তাঁরা জানতে চেয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তর্ক করেছে, আলোচনা করেছে। আমরা এইসব আলোচনাসভা থেকে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারছি। নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে পাচ্ছি। পরম্পরা রেখেই আমরা শুনলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডির অধ্যাপক মধুজা মুখোপাধ্যায়ের আলোচনা। ২৯ জানুয়ারি আমদের সিনেমা স্লাইডের মাধ্যমে দেখানো হয় ‘টু উইম্যান অ্যান্ড এ জেনরি রিইনভেন্টিং ওয়েস্ট’ ছবিটির পাঁচটি স্ল্যাব। সেই ছবি নিয়ে মনোগ্রাহী আলোচনা করেন মধুজা। ছবির বিষয় বস্তু ধরে মেয়েদের গৃহস্থ হিংসা, বাড়ির হেনস্থা, যৌন হেনস্থা প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। তাঁর কথায় ‘’It is very self consciousness film.’’ এদিনেও ফিল্মস্টাডির ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল নজরে পড়ারমতো বিষয়। যার সুবাদে আমরা তুলনামূলক এবং মতবিনিময় আলোচনা শুনতে পেলাম।

আগামী প্রজন্মের কথা আলোচনা করতে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধির নাম এসে যায়। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে রাহুল গাঁধি আমেরিকা সফর করেন। পরপর কয়েকটি বৈঠকও করেন তিনি। ১৯ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান দলের কয়েকজনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন তিনি। সংবাদ মাধ্যম সূত্রের খবর, ওইদিনের বৈঠকে রাহুল গাঁধি দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারি, ও অসহিষ্ণুতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সূত্রের খবর কংগ্রেসের তৎকালীন সহ সভাপতির চিন্তাভাবনা মার্কিন নীতি নির্ধারকদের পছন্দ হয়েছে। এবং রাহুলের বক্তব্য মার্কিন দেশে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রিন্সটন বিশ্ব বিদ্যালয়ে যে ভাষণ দিয়েছেন সেই আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, রোজগার দিতে পারেনি কংগ্রেস। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার কারণও বেকারদের কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

 

এই নিবন্ধে আমরা ৩০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক কলকাতা বই মেলাকে বেছে নেব। আমেরিকান লাইব্রেরির উদ্যোগে এবারের বই মেলার উদ্বোধনের দিনে আমেরিকান সেন্টারে একটি অনুষ্ঠান হয়। স্টলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কনসাল জেনারেক ক্রেগ হল। তারপর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল চমক। ‘এষা গোস্বামী ড্রান্স ট্রুপে’-র পরিচালনায় আমরা দেখলাম একটি অসাধারণ উচ্চ ঘরানার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে আমেরিকান ধ্রুপদী সঙ্গীতের মূর্ছনা। এবং ইংরেজি ভাষায় পাঠ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তথা আধুনিক গণতন্ত্রের অগ্নীশ্বর ব্যক্তিত্ব আব্রাহাম লিঙ্কনকে নিয়ে ছিল নাট্যরূপ। একটি ঘণ্টা অনবদ্য অতুলনীয় গান এবং নৃত্যের যে অভিঘাত আছড়ে পড়ছিল তাতে মনে হচ্ছিল গঙ্গা এবং আটলান্টার সম্মিলিত স্পর্শকাতর বরফের টুকরো আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আবিশ্ব চরাচরে। অনুষ্ঠান শেষে সেই কথা উল্লেখ করলেন কলকাতার কনসাল জেনারেল ক্রেগ হল। তিনি বললেন, ‘’অসাধারণ অনুষ্ঠান দেখলাম আজ। ভারতীয় নাচ, টেগোরের গান এবং আমেরিকার ক্ল্যাসিক্যাল গান। আমি নিজেকে গর্বিত মনে করছি। ‘এষা গোস্বামী ডান্স ট্রুপ’-এর শিল্পীদের আমি শুভেচ্ছা জানাই। এই ধরণের অনুষ্ঠান আমাদের সামনে হাজির করার জন্য। ে যেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মেল বন্ধন।

 

Leave a comment

Filed under Uncategorized

ভারতের বাজেট আরও এগিয়ে আনলে কেউ কি আপত্তি করবেন? প্রান্তিক ভারত লাভবান হবেতো?

গত বছর থেকে ভারতীয় বাজেট একমাস এগিয়ে এসেছে। আমাদের রাজ্যের বাজেটের সময়সূচীর বদল হয়েছে। আমরা বলব ভারতীয় বাজেট নভেম্বর মাসে এগিয়ে আনা হোক। কেউ আপত্তি করবে বলে মনে হয় না। ভারতে আর্থিক বছর শুর হোক ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবছর জাতীয় বাজেট অধিবেশনের আগে সংবাদ মাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যেই বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রক সূত্রের খবর ভারতের অর্থনীতির খোল নলচে বদলে দিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি জুটি। প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দেখানো পথ ধরে তাঁর উত্তরসূরি ডাঃ মনমোহন সিংহ যে ভারতকে সামনে হাঁটার রাস্তা চিনিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই সূত্রায়ন মেনে দেশের অর্থনীতির পরিকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছেন। এটা অবশ্যই হক কথা। আবার আধুনিক ভারতের উপযোগী উদার অর্থনীতির মানদন্ডে বাজেট করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। ইতিমধ্যেই রেলমন্ত্রকে ব্যপক বিলগ্নীকরণ হয়েছে। এবং আলাদা করে রেল বাজেট পেশ করার বস্তাপচা ধ্যানধারণা থেকে ভারত নামক দেশের ম্যানেজাররা বেরিয়ে আস্তে পেরেছেন। অর্থ মন্ত্রক সূত্রে আরও খবর, আয়কর ছাড়ের ঊর্ধসীম আড়াই লক্ষ থেকে বেড়ে ৩ লক্ষ টাকা হতে পারে। এবারের বাজেটের আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সুইৎজারল্যান্ডের দাভোস সফর করে ফিরলেন। দাভোসে ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে’র মঞ্চ থেকে তিনি ভারতে বিনিয়োগ করার জন্য উদাত্ত কণ্ঠে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন। আচ্ছে দিনের ‘মোদী ব্র্যান্ড’ থেকে বেরিয়ে এসে ইভেন্ট ম্যানেজারের মতো ‘আধুনিক ভারত’কে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘’ভারতে বিনিয়োগ করুন। আমাদের দেশে বিনিয়োগ করা এবং ভারতে বেড়াতে যাওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে।‘’

বিশ বছর পরে ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী দাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর আহ্বানে আরও বলেছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতির আয়তন দ্বিগুণ বেড়ে হবে ৫ লক্ষ কোটি ডলারের। ওইদিনের উল্লেখিত সম্মেলনে মোদী জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাস এবং রক্ষণশীল বিশ্বায়নের প্রসঙ্গও তুলেছেন। ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে যে সব বাঁক রয়েছে, সেগুলি সাগরের অতল গভীর অর্থনীতির মত। সেই বাঁকগুলির অন্যতম কোম্পানী আইন যা এককথায় বললে, ‘জাতীয় কোম্পানী আইন ট্রাইব্যুনাল (এনসিএলটি)’ দেউলিয়া আইন। সম্প্রতি ফিনান্সিয়াল জার্নালিস্টস ক্লাব এবং কলকাতা প্রেস ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। কলকাতা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ২৩ জানুয়ারির এই আলোচনা সভায় দেউলিয়া আইন বিশেষঞ্জ মমতা বিনানি বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘’Insolvency professionals are not finding buyers for small companies due to various reasons in which IBC is invoked unlike in the cases of large companies where bidders are available. In absence of bidders are compulsorily going through liquidation once the resolution period is over.’’

‘অল ইন্ডিয়া ইনসলভেন্সি প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মমতা আরও বলেন, ‘’কেন্দ্রীয় সরকারের অভিমত একটাই মঞ্চ হোক। দেওলিয়া আইন, সংগঠিত ক্ষেত্র, অসংগঠিত ক্ষেত্র, রেজিস্ট্রেশন, দেওলিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে একটাই ‘কোড’ হোক। সেই কোডের নাম ‘Insolvency and Bankruptcy Code (IBC).   সেদিনের আলোচনাসভায় আলোচ্য প্রতিবেদক আমন্ত্রিত ছিল। সেদিনের সভা থেকে আরও জানা যায়, এই কোড এমএসএমই (MSME) গোষ্ঠীভুক্ত সংস্থা ব্যবহার করতে পারবে। মমতা বিনানির কথায় অনেক ছোট সংস্থা আইন না জানার জন্য কোম্পানি বন্ধ করতে পারে না। আবার সরকারের কাছে পাওয়া সুবিধাগুলির সুযোগ  ওইসব ব্যক্তি পায় না। যেমন ধরুন অনেক ছোট বিনিয়োগকারী ‘ই-মেল’ খুলে রেখে দিয়েছে। কিন্তু অঞ্জানতার কারণে ব্যবহার করতে জানে না। ফলে সরকার বা অন্য কেউ মেল করলে সেই ব্যবসায়ী খোঁজ রাখতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে যে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন না, তাঁর ই-মেল ঠিকানা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। মমতা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘’কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় দেউলিয়া আইনের রূপরেখা দিয়ে দিয়েছে, এখন কিভাবে ব্যবহার করা যায় সেটা আমাদের ছোট ব্যবসায়ীদের বোঝাতে হবে। এই দায়িত্ব সংবাদ মাধ্যমকেও নিতে হবে।‘’

এদিনের আলোচনা সভা থেকে আরও জানা যায়, ভারতে কোম্পানী বিষয়ক ১১টা  ট্রাইব্যুনাল কোর্ট আছে। সরকার এই মুহূর্তে আরও তিনটে ট্রাইব্যুনাল কোর্ট করতে চাইছে। এই কোর্ট তিনটি হবে কোচি, জয়পুর এবং ভুবনেশ্বরে। আগামীদিনে আরও ১০টা কোর্ট তৈরি করা হবে। এই মুহূর্তে কলকাতায় ২জন বিচারপতির একটি ডিভিশন বেঞ্চ আছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেদিন দাভোসে ভারতকে বিনিয়োগের বিশেষ দেশ হিসেবে তুলে ধরছেন সেইদিন আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (আইএমএফ) পূরবাভাস দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির এক সমীক্ষার রিপোর্ট উল্লেখ করে আইএমএফ জানিয়েছে চলতি অর্থবর্ষে ভারতের বৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশই থাকবে। আর পরের অর্থবর্ষে বৃদ্ধি পৌছবে ৭.৮ শতাংশে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভারত আর্থিক উন্নতির মানদণ্ডে বিশ্বের দ্রুততম দেশ হয়ে উঠার দাবি করতে পারবে।

এই পর্যন্ত চেনা ভাসা। চেনা অঙ্ক। কিন্তু ২৩ জানুয়ারি ওই একই দিনে আরও একটি রিপোর্ট আমাদের সামনে আসে। ভারতের আর্থিক অসাম্যের বিষয়ে ‘অক্সফ্যাম’ নামে একটি সংস্থা রিপোর্ট প্রকাশ করে। ওই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দেশের ১ শতাংশের হাতে রয়েছে ৭৩ শতাংশ সম্পদের মালিকানা। বিস্তারিত যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তাঁর কিছুটা অংশ আমাদের হাতে এসেছে। ভারতে মোট সম্পদের ৭৩% কুক্ষিগত আছে দেশের ১% বিত্তবানদের হাতে। ভারতের ১% ধনকুবেরের সম্পদ গত এক বছরে ২০.৯ লক্ষ কোটি টাকা বেড়েছে। এই হিসেব ভারতের ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের মোট বাজেটের সমান। ১ বছরে ভারত নতুন ১৭ জন কোটিপতি পেয়েছে। দেশে সর্বমোট কোটিপতির সংখ্যা এখন ১০০ জন। ভারতে কোটিপতিদের সম্পদ গত বছরে ৪.৮৯ লক্ষ কোটি বেড়েছে। তুলনামূলকভাবে দেখলে এই হিসেব আমাদের দেশের রাজ্যগুলির স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বাজেটের ৮৫% খরচের সমান। পাশাপাশি ১% বিত্তবানের সম্পদ এক বছরে ২০.৯ লক্ষ কোটি টাকা বেড়েছে। এবং ভারতের কোটিপতিদের ৩৭% পারিবারিক সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। কোটিপতিদের মোট সম্পত্তির ৫১% তাঁদের হাতে রয়েছে। এক শতাংশ ধনকুবেরের সম্পদ দেশের বাজেটের সমান। প্রান্তিক কৃষকের সারাজীবনের রোজগার কোনও একটি বেসরকারি সংস্থার সিইও করেন মাত্র ১৭ দিনে।

এই তথ্য হাতে আসার পরে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি সঠিকভাবেই টুইট করেন, ‘’সুইৎজারল্যান্ডে স্বাগত! দয়া করে দাভোসে বলুন, জনসংখ্যার ১ শতাংশের হাতে মোট সম্পদের ৭৩ শতাংশ গেল কি ভাবে?’’

একবিংশ শতাব্দীর ‘ইন্ডিয়া’ এগচ্ছে। সবাই মেনে নেবে কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রান্তিক ভারত? কর্মসংস্থান? স্মার্ট ভিলেজ? দেশের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ থেকে পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, সাংবাদিক প্রত্যেকের মুখে একটাই কথা গ্রামীণ কর্মসংস্থান করতে না পারলে ভারতের উন্নয়ন থমকে থাকবে। প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে রাজনীতির উর্ধে উঠে ব্যপক কর্মযঞ্জের আয়োজন করতে না পারলে ভারতের শহর কেন্দ্রীক উন্নয়ন এক সময় মুখ থুবড়ে পড়বে। যে চিন্তা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধি করেছিলেন। টেলিকম শিল্পের আড়ম্বরহীন প্রচার দিয়ে ব্যপক এসটিডি-আইএসডি বুথের মাধ্যমে। এবং কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ এনে।

Leave a comment

Filed under Uncategorized